হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যতীত অন্য মানুষের, ‘বিধর্মী’দের প্রবেশ নিষেধ, এই মর্মে ব্যানার ও পোস্টার পড়েছে বীরভূমের দুই প্রাচীন মন্দির কঙ্কালীতলা ও ফুল্লরায়, বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোনোর অব্যবহিত পরে। প্রথম মন্দিরে বিজেপির কিছু নেতা দুধ-গঙ্গাজল দিয়ে বিশেষ পূজা এবং ‘শুদ্ধকরণ’ও করেছেন; বলেছেন— মন্দিরের আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও ধর্মীয় মর্যাদা অটুট রাখতেই এই উদ্যোগ। দু’টি জায়গাতেই পরে ব্যানারে-পোস্টারে লিখে দেওয়া হয়েছে, এখন থেকে মন্দিরে কোনও বিধর্মী মানুষ প্রবেশ করতে বা পুজো দিতে পারবেন না, এক ও একমাত্র হিন্দুরই সেই অধিকার।
রাজনীতির পালাবদল হলে স্বাভাবিক ভাবেই তার প্রভাব এসে পড়ে সমাজ পরিবার শিক্ষা স্বাস্থ্য-সহ সব প্রতিষ্ঠান ও পরিসরেই। আজকের ভারতে ধর্মও স্বভাবতই তার ব্যতিক্রম নয়— বিশেষত, যেখানে নির্বাচনী প্রচারে প্রকট ও প্রচ্ছন্ন ভাবে ধর্মের উপস্থিতি ছিল কার্যত সর্বব্যাপী। বীরভূমে যা ঘটেছে, তাকে প্রাথমিক অত্যুৎসাহের পরিণতি বলে ভাবতে পারলে রাজ্যবাসী খানিক স্বস্তি পাবেন। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক এখনও বিশ্বাস করতে চাইবেন যে, অনতি-অতীতের মতো আজও শিক্ষা সংস্কৃতি থেকে শুরু করে খাদ্যাভ্যাস বা ধর্মাচরণ, সব কিছুতেই এই রাজ্যের উদার চরিত্রটি বজায় আছে। ভারতের সংবিধানে যে বহুত্ব ও বৈচিত্রের কথা বলা আছে, বাঙালিরা আবহমান কাল শুধু তা ধারণ ও লালনই করেননি, রাজনৈতিক জমানা-নির্বিশেষে সেই অভ্যাসটি অটুট রেখেছেন। এই কারণেই, স্বাধীনতার আগে ও পরে নানা সময়ে ধর্মীয় দাঙ্গা-সংঘর্ষে রক্তাক্ত হয়েও, যে কোনও ধর্মের মূলগত উদার মানবিক সুরটি পশ্চিমবঙ্গে অক্ষুণ্ণ থেকেছে— কোনও দেবালয় বা ধর্মস্থানের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের কথা আলাদা, কোনও মানুষের প্রবেশ সংক্রান্ত বিধিনিষেধের রোষচক্ষু সেখানে দেখা যায়নি। এই পরমতসহিষ্ণুতাই পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এতকাল ভারতে ও বিশ্বে আলাদা, বিশিষ্ট করে তুলেছিল। কঙ্কালীতলা ও ফুল্লরা মন্দিরে বিজ্ঞাপিত বিভেদ-বার্তায় সেই ঐতিহ্যে দাগ পড়ল। ফলে, এই বিষয়ে প্রশাসনিক কঠোরতা জরুরি।
অনুমান করা চলে, আসল সমস্যা অন্যত্র। ভারতের যে কোনও বড় হিন্দু মন্দির ও তার সংলগ্ন এলাকাগুলি যে-হেতু বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও রুজি-রোজগারের জায়গা, সেখানে শুধু হিন্দু ছাড়াও অন্য নানা ধর্ম জাতিগোষ্ঠীর মানুষের যাতায়াত অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। এহেন বিধিনিষেধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এই দরিদ্র নিম্নবিত্ত মানুষেরা, বলার অপেক্ষা রাখে না। উপার্জনের পথ রুখে এঁদের ঢিট করাই উদ্দেশ্য কি না, সে প্রশ্ন অমূলক নয়। সম্প্রতি প্রতিবেশী রাজ্য অসমে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মুসলমানদের ‘ভাতে মারা’র যে প্রচার করেছেন, তা উদ্বেগের কারণ। উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার বা কেদারনাথে সাম্প্রতিক কালে যে ভাবে বিধর্মী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা উচ্চারিত হয়েছে, বা দক্ষিণ ভারতে প্রাচীন মন্দিরে দলিত বা নারীদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা দেখা গিয়েছে, সেই একই ভঙ্গিতে, ‘মন্দিরের ঐতিহ্য ও শাস্ত্রসম্মত নিয়ম’ দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মন্দিরে ব্যানার-পোস্টার টাঙানো হল। পশ্চিমবঙ্গবাসী এতকাল ধর্মীয় ঐতিহ্য ও শাস্ত্রজ্ঞান সম্পর্কে নিতান্ত অজ্ঞ ছিলেন, তা-ই কি ধরে নিতে হবে? ধর্মের নামে এই ভেদাভেদের রাজনীতি প্রতিরোধের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে