ইজ়রায়েলি হামলায় তছনছ লেবাননের টায়ার শহর। মঙ্গলবার। ছবি: রয়টার্স।
‘‘আপনি এক জন বদ্ধ উন্মাদ। আমি না থাকলে এত দিনে জেলের ভিতরে থাকতেন। আপনাকে এখন সকলে ঘৃণার চোখে দেখে...’’— কথাগুলি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। আর ফোনের অপর প্রান্তে শ্রোতার নাম বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। গত কাল লেবাননের রাজধানী বেরুট এবং তার শহরতলিতে হামলার নির্দেশ দেওয়ার পরে কার্যত এই ভাষাতেই ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। আজ এ কথা জানিয়েছে আমেরিকার একটি নামী সংবাদ সংস্থা। তাদের দাবি, নেতানিয়াহুর সঙ্গে এই মর্মে বার্তালাপের পরই গত কাল সকালে (আমেরিকার সময়) ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশালে লিখেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কথা হয়েছে। উনি আশ্বাস দিয়েছেন, বেরুটে আর সেনা পাঠাবেন না...’। অন্য দিকে, ইজ়রায়েলে হামলা না চালানোর ব্যাপারে হিজ়বুল্লার তরফেও মিলেছিলে আশ্বাস। তবে এই আশ্বাস-বিনিময়ের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই দক্ষিণ লেবাননে ফের ড্রোন হামলা চালানোর অভিযোগ উঠল ইজ়রায়েলি সেনার বিরুদ্ধে। ঘটনায় আট জন নিহত হয়েছেন বলে খবর। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ ফোনে কথা বলেছেন লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে। গালিবাফের বার্তা, লেবাননের বুকে ইজ়রায়েল হামলা বন্ধ না করলে, ময়দানেনামবে তেহরান।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই মুহূর্তে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে ঘরে-বাইরে ঘোর চাপের মুখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। প্রথমে হরমুজ় প্রণালী আর এখন লেবানন কাঁটায় জর্জরিত ট্রাম্প চাইছেন যে কোনও মূল্যে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু হিজ়বুল্লাকে কোণঠাসা করতে চেয়ে লেবাননের উপর আজও হামলা চালিয়েছে ইজ়রায়েল। এ দিকে, ইজ়রায়েল লেবাননের উপর হামলা পাকাপাকি ভাবে বন্ধ না করলে, আমেরিকার সঙ্গেও শান্তি আলোচনায় বসতে নারাজ তেহরান। গত কাল ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের পরে নেতানিয়াহু সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে জানিয়েছিলেন, হিজ়বুল্লার তরফে ইজ়রায়েলে কোনও রকম হামলা চালানো হলে, পূর্ব পরিকল্পনা মতোই লেবাননে চলবে আক্রমণ। যদিও আজই দক্ষিণ লেবাননে ড্রোন হামলা চালানোর পাশাপাশি সীমান্তের প্রায় সাত কিলোমিটার ভিতরে দক্ষিণ লেবাননের হাদাথা গ্রামে ইজ়রায়েলি স্থলসেনার ঢুকে পড়ার অভিযোগ তুলেছে হিজ়বুল্লা। ইজ়রায়েলি সেনাকে রুখতে ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রছোড়ে লেবাননও।
এ দিকে, আজ সারা দিনে উত্তর ইজ়রায়েলের নানা জায়গায় একাধিক বার সাইরেন বাজার খবর সামনে এসেছে। এমনকি আকাশে একাধিক অজ্ঞাত-পরিচয় ড্রোন উড়তে দেখা গিয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। সেগুলিকে গুলি করে নামিয়েছে ইজ়রায়েলি সেনা। পুরো বিষয়টিকে লেবাননের পাল্টা আক্রমণ হিসেবেই ব্যাখ্যা করছে পশ্চিম এশিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলি।
আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে যে পরমাণু চুক্তি করেছিলেন, এত দিন তার কড়া সমালোচক ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর মতে, সেটি ছিল ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বাজে চুক্তি’। ওবামা প্রশাসনের আমলের সেই চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ১৫ বছর, অর্থাৎ ২০৩০ সাল পর্যন্ত ইরানের পরমাণু গবেষণার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। প্রথম দফায় প্রেসিডেন্টের পদে বসেই ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, চুক্তিটি যথেষ্ট ‘শক্তিশালী’ নয়। আর সেই কারণেই ২০১৮ সালে সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি।
এর পরেই কার্যত গতি বেড়েছিল ইরানের পরমাণু গবেষণার। এই প্রসঙ্গে লন্ডনের মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু মোরান সমালোচনার সুরে বলছেন, ‘‘যদি সেই চুক্তিটি এখনও বহাল থাকত, তবে আমাদের এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তেই হত না।’’ আমেরিকা এই মুহূর্তে ইরানের সঙ্গে যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির উপর জোর দিচ্ছে, তাতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের উপর ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং ইরান কখনও পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না— এমন কয়েকটি প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ রয়েছে। এই প্রসঙ্গে ব্রিটেনের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক শানাহানের মত, ‘‘...বিষয়টি ওবামার চুক্তির উপর ভিত্তি করেই সাজানো হয়েছে বলে মনেহচ্ছে।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে