WB Election 2026 Result

নব বঙ্গ বোধন

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির জয় ভারতের জন্যও ঐতিহাসিক ঘটনা। এ বার প্রথম থেকেই দেশব্যাপী আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই রাজ্যের ভোট।

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ০৯:২৩
Share:

পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক পর্বান্তর। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় বাংলার ইতিহাসের একটি বিতর্কোর্ধ্ব মাইলফলক। এ বারের ভোট কেবল এই রাজ্যের জন্য নতুন শাসক দল এনে দিল না— রাজ্যে সর্বার্থেই এক নতুন যুগের সূচনা করল। এমন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিকে পশ্চিমবঙ্গের মূলস্রোতে প্রতিষ্ঠা করল, যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলা থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গ অনেক রকম ঘটনার মধ্যে দিয়ে এসেছে— হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষ, দেশভাগ, উদ্বাস্তু সঙ্কট, চরমপন্থী রাজনীতি, দীর্ঘ বামশাসন— কিন্তু, রাজ্য রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী শক্তি এই প্রথম বার এত প্রশ্নাতীত ভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠল। একই সঙ্গে, এই রাজ্যে ১৯৭৫ সালের পর প্রথম বার এমন দল সরকার গঠন করল, যে দল একই সঙ্গে ভারতেরও কেন্দ্রীয় শাসক। লক্ষণীয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্বান্তর দেখিয়ে দেয় যে, সরকার গড়ার জন্য যে দল আসে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অভিষিক্ত হয়েই আসে। এ বারও একই ঘটনা ঘটল। সেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে দ্ব্যর্থহীন ভাবে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও কর্মধারার জয়ের বার্তা, মোদী-জাদুর প্রতিফলন, এবং কখনও এই রাজ্যে ক্ষমতা-ধারণের অভিজ্ঞতাহীন নতুন হিন্দুত্ববাদী দলের প্রতি প্রবল জন-আস্থা জ্ঞাপন।

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির জয় ভারতের জন্যও ঐতিহাসিক ঘটনা। এ বার প্রথম থেকেই দেশব্যাপী আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই রাজ্যের ভোট। ভোটের ফলে সমগ্র দেশের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জয়যাত্রায় যোগ হল নতুন উদ্যম, প্রত্যয় ও শক্তি। উত্তর ও মধ্য ভারতভূমির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ— এবং তামিলনাড়ুকেও— এই হিন্দু ভারতের মানচিত্রে যোগ করা ছিল বিজেপি-আরএসএস-এর ‘হিন্দু ভারত’ প্রতিষ্ঠা প্রকল্পের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ: ২০২৬ সাল তা সম্পন্ন করল। সে দিক দিয়ে দেখলে, এই ভোট ছিল এক দিকে মোদী-শাহ বনাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তি-ক্যারিশমা ও রাজনীতি-কৌশলের সম্মুখসমর; অন্য দিকে, সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদ ও তার শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরোধীর লড়াই। স্বাধীনতা ও দেশভাগের আট দশক পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে বোঝা গেল, সেই লড়াই শেষ, কেন্দ্রীয় শাসকপক্ষকে আটকানোর মতো আঞ্চলিক রাজনীতির দিন হয়তো এ বার ফুরোতে চলেছে। সংখ্যালঘু-বিদ্বেষের পাত্রও পূর্ণতায় পৌঁছেছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেস এই বিশাল জনরায়ের অন্যতর, ভিন্নতর ব্যাখ্যা করতে চাইবেন— তবে তাঁরা যা-ই বলুন না কেন, এই ফলাফলের মধ্যে রয়েছে তাঁদের শাসনধারার বিরুদ্ধে উদ্বেলিত জনক্ষোভের অভ্রান্ত স্বাক্ষর। দুর্নীতি, দুর্বিনয়, অনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের প্রবল ও তীব্র রায়। একের পর এক ঘটনা ক্রমে এই অগ্ন্যুৎপাতের চূড়ান্ততায় তাঁদের টেনে এনেছে। আইনশৃঙ্খলার অনুপস্থিতি, নারী-নিরাপত্তার অভাব, শিক্ষাক্ষেত্রের গভীর অবনমন, এবং সর্বোপরি কর্মহীনতার পরিমণ্ডল সাধারণ মানুষকে কতখানি অধৈর্য করে দিয়েছিল, তা এই ভোটের ফল খুলে মেলে দেখিয়ে দিল। মমতা-উত্তর রাজনৈতিক পালাবদলের এই মহাক্ষণে পশ্চিমবঙ্গের প্রয়োজন, এমন এক ভবিষ্যৎ সরকার— যা কেবল একটি মহাপরাক্রান্ত রাজনৈতিক দল নয়, যা এই সঙ্কটাপন্ন বঙ্গীয় সমাজ ও অর্থনীতির দক্ষ শুশ্রূষা করতে পারবে। এ জন্য বিজেপির উপর বাংলার মানুষ ভরসা করেছেন, তাদের হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়েছেন। উন্মার্গগামী দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের নিরাময়ের ভার দিয়েছেন। স্তব্ধ অর্থনৈতিক উন্নয়নের বদ্ধমুখ মুক্ত করার ভার দিয়েছেন। অর্থাৎ নতুন শাসকের সামনে এখন বিরাট দায়িত্ব। যে বঙ্গীয় সমাজের শাসনাধিকার তাঁরা পেলেন, বিবিধ ধর্ম-জাতির সম্মিলনে সমৃদ্ধ তার এতদিনকার ঐতিহ্য। সেই পশ্চিমবঙ্গ আজ ভারতীয় রাজনীতির মূল স্রোতে নিজেকে যুক্ত করতে প্রস্তুত। নতুন শাসকও তার দায়িত্ব বহনে প্রস্তুত তো?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন