Divorce Case

পাশে থাকা

যুগ-যুগান্ত ধরে ভারতীয় সমাজচিত্রে পিতৃতন্ত্র লালিত কন্যাদান ও কন্যাদায় ইত্যাদি ধারণাগুলি একটি মেয়ের পরিবারের উপর অনৈতিক ভার চাপিয়ে রেখেছে। তা যেন কন্যাকে সম্পত্তি জ্ঞানে অন্যকে চিরতরে হস্তান্তরের সমর্থক।

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:১১
Share:

দীর্ঘ দাম্পত্য যন্ত্রণার পর পারিবারিক আদালত যখন মেয়ের বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর করল, তখন তাঁর অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বাবা আদালত চত্বরের বাইরে সেই মুহূর্তটি সাড়ম্বরে উদ্‌যাপন করেছেন আত্মীয়দের নিয়ে ঢাক-ঢোলসহকারে নাচ, লাড্ডু বিতরণের মাধ্যমে। পরিবারের সদস্যদের পোশাকেও লেখা ছিল কন্যারত্নটিকে স্নেহের বার্তা, অনুরূপে মেয়ের পোশাকে লেখা পরিবারে ভালবাসার কথা। মিরাটের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি সমাজমাধ্যমে শোরগোল ফেলেছে, কারণ তা একটি নারীর বিবাহবিচ্ছিন্ন হওয়া নিয়ে পরিচিত সামাজিক ধ্যানধারণা ও প্রতিক্রিয়ার বিপ্রতীপে যাওয়ার দৃষ্টান্ত। অন্ধকারে-নীরবতায় বিবাহবিচ্ছেদ পালনের বিপরীতে; সন্তোষের প্রকাশ। এই কাজ করে পিতার বার্তা, লোকে কী বলবে সেই চিন্তার চেয়ে মেয়ের সম্মান ও শান্তি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কন্যার এ-হেন সিদ্ধান্ত তাই দুঃখ-মুহূর্ত নয়, উদ্‌যাপনীয় মুহূর্ত।

মিরাটের এই ঘটনাটি আপাত-বিক্ষিপ্ত হলেও একটি জরুরি বার্তা বহন করে আনে। যুগ-যুগান্ত ধরে ভারতীয় সমাজচিত্রে পিতৃতন্ত্র লালিত কন্যাদান ও কন্যাদায় ইত্যাদি ধারণাগুলি একটি মেয়ের পরিবারের উপর অনৈতিক ভার চাপিয়ে রেখেছে। তা যেন কন্যাকে সম্পত্তি জ্ঞানে অন্যকে চিরতরে হস্তান্তরের সমর্থক। যার সঙ্গে জুড়ে যায় অলিখিত প্রত্যাশা— নতুন পরিবার যেমনই হোক, যে কোনও পরিস্থিতিতেই মেয়েটিকে সব সহ্য করতে হবে ও বিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে। অত্যাচারের সেই জীর্ণ-বিজীর্ণ মুষলেরই অন্য নাম কন্যাদায়। তাকেই অবশেষে কন্যার মঙ্গলের দায় রূপে উত্তরণের কান্ডারি হলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মহোদয়। এই ইতিবাচক আচরণ জানান দেয় যে বিবাহবন্ধনের নামে অন্যায়-অবিচার ঘটে চললে তাকে প্রত্যাখ্যানের দর্পের মধ্যেই নিহিত পরিবার ও ব্যক্তির প্রকৃত সম্মান। তবে, এ ঘটনা যে বিরল, সন্দেহ নেই। ভারতীয় সমাজে এখনও বিবাহ নামক সামাজিক বন্ধন থেকে ব্যক্তির ইচ্ছামুক্তির ধারণাটি সাধারণ ভাবে গ্রহণীয় নয়। এবং বহু ক্ষেত্রেই কন্যার পক্ষ থেকেই নানা রকম বাধা তৈরি করে তাকে শান্তিহীন সুখহীন অমর্যাদার বিবাহ মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। সন্দেহ নেই, বিবাহবিচ্ছেদের সঙ্গে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সন্তানসংক্রান্ত আইনি জটিলতা, এবং সর্বোপরি একাকিত্বের বেদনা জড়িয়ে থাকে। তবে এই সব সমস্যাই সমাধানযোগ্য, সে কথাও এখন সমাজের নানা অংশে বিভিন্ন দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে দিচ্ছে।

বিবাহ বিষয়টির মধ্যে কতখানি প্রাতিষ্ঠানিক, কতখানি সামাজিক, কতখানি ব্যক্তিজৈবনিক, এই প্রশ্নই আসলে মূলগত। পুরুষ-নারী উভয়েরই ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নটিকে বিবাহের মধ্যে নিয়ে আসা যায় কি না, তা কত দূর অবধি সম্ভব ও সঙ্গত, সবই বিতর্কযোগ্য। তবে যেখানে স্পষ্টতই অন্যায় বা অনাচার জড়িত, যন্ত্রণা ও ক্লেশ অবধারিত, সেখানে ব্যক্তির বোধ ও অভিরুচিকে মান্যতা দিতে পারাই হল আধুনিক সভ্যতার শিক্ষা। গত কয়েক বছরে শহুরে ভারতে যদিও বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা কিয়দংশে স্বাভাবিক ও মান্য হয়ে উঠেছে, একটি নাগরিক সীমানার বাইরে তা নয়। এর মানে এই নয় যে, সব অসুখী দাম্পত্যের পরিণতিই বিবাহবিচ্ছেদ। বিচ্ছেদের উদ্‌যাপনও মূল কথা নয়। মূল কথা হল, ব্যক্তির কষ্টের প্রহরে পরিবার-পরিজনের যত্ন ও সমর্থন। পাশে পাওয়া। পাশে থাকা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন