এস জয়শঙ্কর।
বর্তমান অস্থির ভূ-রাজনীতির যুগে, এক স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন নির্ভরযোগ্য মিত্র থাকা যে-কোনও দেশের ক্ষেত্রেই একটি বড় সম্পদ। কোয়াড গোষ্ঠীতে আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার অবস্থান জোরদার করতে তাই এখন অস্ট্রেলিয়াকে সেই ভূমিকায় দেখতে আগ্রহী ভারত। সেই সূত্রেই সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করার পথে হাঁটল ভারত। পাশাপাশি, দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ‘জয়েন্ট মেরিটাইম সিকিয়োরিটি কোলাবরেশন রোডম্যাপ’ চূড়ান্ত করার প্রচেষ্টাও পুনর্ব্যক্ত করলেন, যার মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল জুড়ে নজরদারি জোরদার করতে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা মোকাবিলায় সামরিক ভাবে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে এগোনো যাবে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এলাকা। এখানে এমন সব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ রয়েছে যার মধ্য দিয়ে প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ বিশ্ববাণিজ্য সম্পন্ন হয় এবং যা এশিয়ার একাধিক অংশের সঙ্গে বাইরের অঞ্চলগুলিকে সংযুক্ত করে। গত মে মাসে প্রকাশিত ‘কোয়াড’-এর বিবৃতি অনুযায়ী, দক্ষিণ ও পূর্ব চিন সাগরে চিনের সামরিকীকরণ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ওই অঞ্চলে দেশটির কার্যকলাপ নিয়ে কোয়াড অন্তর্ভুক্ত ভারত, অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলিরও উদ্বেগ বাড়ছে। বস্তুত, কোভিড-১৯’এর উৎপত্তির বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের জন্য ক্যানবেরার আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০-র পর থেকে তিক্ততা বাড়ে অস্ট্রেলিয়া ও চিনের মধ্যে, যার প্রভাব পড়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যেও। এখনও কৌশলগত বিষয়গুলিতে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েই গেছে। ভুললে চলবে না, ভারতীয় উপমহাদেশের চার পাশে বন্দর ব্যবহারের সুবিধা নিশ্চিত করেছে বেজিং— আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের জিবুতি থেকে শুরু করে পাকিস্তানের গ্বদর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা এবং মায়ানমারের কিয়াউকপিউ পর্যন্ত। তথাকথিত ‘স্ট্রিং অব পার্লস’-এর আওতায় চিনের সামরিক উপস্থিতি এমন সব সামুদ্রিক পথে স্থাপিত হয়েছে, যা অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এ দিকে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের আধিপত্য ভারতের ক্ষেত্রেও উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে— ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ এবং ‘চায়না-পাকিস্তান ইকনমিক করিডর’-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে তারা ভারতকে ঘিরে ফেলছে, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং এমন সব কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করছে, যা এই অঞ্চলে দিল্লির প্রথাগত প্রভাব বলয়কে ব্যাহত করছে।
এমতাবস্থায়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জলপথ উন্মুক্ত করা এবং কোনও একক শক্তির আধিপত্যমুক্ত রাখাটা যেমন একটি অর্থনৈতিক আবশ্যকতা, তেমনই কৌশলগত স্বার্থও বটে। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ সামুদ্রিক নজরদারি এবং সমন্বিত সামরিক অনুশীলনের মাধ্যমে দুই রাষ্ট্রই কূটনৈতিক বোঝাপড়ার বাইরে আরও গভীর সহযোগিতায় আগ্রহী। চিনকে টক্কর দিতে হলে তাই কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং নৌবহরের আধুনিকীকরণের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও বৃদ্ধির দিকেই জোর দিক দিল্লি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে