Bhopal Housewife Mysterious death

‘মানিয়ে নেওয়া’ নয়

সলিসিটর জেনারেলের এই বক্তব্য প্রকৃতপক্ষে ত্বিষার মৃত্যুর দায় শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে সরিয়ে তার মা-বাবার দিকেই ঠেলে দিল কি না, সে প্রশ্ন থাকবে।

শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ০৭:৪৭
Share:

নরকে বাস করছি”, “ফাঁদে আটকে পড়েছি”— বিয়ের অব্যবহিত পরেই এই লিখিত বার্তাগুলি কি এক তরুণীর দাম্পত্য-জীবনের ঘোর সঙ্কটকালটিকে যথেষ্ট প্রকট করে তোলে না? সেই বার্তাতেই পরিবারের ঘনিষ্ঠজনরা সতর্ক হলে, সন্তানের প্রতি সাহায্যের হাতটি সময়মতো বাড়িয়ে দিলে হয়তো এক তরুণীর জীবন বাঁচত। কিন্তু তা হয়নি। হামেশাই তা হয় না। ভোপালের ত্বিষা শর্মাই শুধু নন, ভারতের প্রত্যেক কোণে অগণিত মেয়ের জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে চরম বিপদের মুহূর্তেও পরিবারের সদস্যদের ‘মানিয়ে নেওয়া’র পরামর্শটি। সম্প্রতি ত্বিষা শর্মার মৃত্যু মামলায় মধ্যপ্রদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থিত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার কথাগুলি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— মা-বাবার জন্য মৃত মেয়ের চেয়ে বিবাহবিচ্ছিন্ন মেয়ে থাকা অনেক ভাল।

সলিসিটর জেনারেলের এই বক্তব্য প্রকৃতপক্ষে ত্বিষার মৃত্যুর দায় শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে সরিয়ে তার মা-বাবার দিকেই ঠেলে দিল কি না, সে প্রশ্ন থাকবে। ত্বিষার মৃত্যুর কারণ কী, কে প্রকৃত দায়ী, তার অনুসন্ধানও চলবে। কিন্তু এই উক্তি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিবেককে আরও এক বার নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল। ভারতীয় সমাজ, যা অনেকাংশেই এখনও তার প্রবল পুরুষতান্ত্রিক চরিত্র থেকে মুক্ত হতে পারেনি, বিবাহবিচ্ছিন্ন মেয়েদের প্রতি সহমর্মী হতে শেখেনি। বরং শিশুকাল থেকেই শিখিয়ে এসেছে ‘অন্য’ বাড়িতে মানিয়ে নেওয়ার এবং মেনে নেওয়ার দায়টি মুখ্যত মেয়েদেরই। সেই পথে প্রয়োজনে তার আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হবে বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে। বিবাহবিচ্ছিন্ন মেয়ে যে-হেতু সেই নীতি-নির্দেশিত পথে হাঁটতে চায় না, তাই সমাজের এই অংশটি তার প্রতি সন্দেহপ্রবণ, এবং সেই হেতু তাকে ব্রাত্য করে রাখার পক্ষপাতী। মা-বাবারাও যে অত্যাচার হচ্ছে জেনেও তাকে লঘু করে দেখাতে চান, তার পিছনে সমাজের এই মনোভাব অনেকখানি দায়ী। তদুপরি, ভারতীয় পরিবারগুলির এক বৃহৎ অংশ আজও মেয়েদের বোঝা মনে করে। বিবাহের পর মেয়ের দায়িত্ব অন্য পরিবারটির হাতে অর্পণ করে দায়মুক্ত হতে চায়। নির্যাতিতার অভিযোগগুলি তাই বহু ক্ষেত্রেই অ-শ্রুত থেকে যায়।

কিন্তু এই তত্ত্ব বধূ নির্যাতনের মতো ঘৃণ্য অপরাধগুলির ক্ষেত্রে স্বামী-শ্বশুরবাড়ির দায়িত্বকে বিন্দুমাত্র লঘু করে না। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র সমীক্ষা কিছু বছর আগে জানিয়েছিল, নারী-নির্যাতনের মামলাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ‘স্বামী ও তাঁর পরিবারের দ্বারা নির্যাতন’-এর ঘটনা, শতাংশের হিসাবে মোট নারী-নির্যাতনের ৩১.৮ শতাংশ। ২০২১ সালে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে ৪৯৮এ ধারায় মামলা হয়েছিল কুড়ি হাজারটির কাছাকাছি। স্পষ্টতই নথিভুক্ত না-হওয়া অপরাধের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব শুধুমাত্র নির্যাতিতার পরিবারের নয়, রাষ্ট্রের। বধূ নির্যাতন প্রতিরোধে শক্তিশালী আইন রয়েছে দেশে। তার যথাযথ প্রয়োগ যেন সব ক্ষেত্রে হয়, নির্যাতিতা পুলিশ-প্রশাসনের সাহায্য যাতে সহজেই পায়, নিশ্চিত করতে হবে। প্রভাবশালী পরিবার, পারিবারিক কলহে পুলিশের হস্তক্ষেপ না করা— এমন কোনও অজুহাত যেন সুবিচারের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র দায়িত্বশীল হলে এবং পরিবার সামাজিক চোখরাঙানির ঊর্ধ্বে সন্তানের কল্যাণকে প্রাধান্য দিলে ভবিষ্যতে অনেক ত্বিষার প্রাণ বাঁচবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন