চারটি শ্রম বিধির একটিও যে বলবৎ করেনি পশ্চিমবঙ্গ, তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে শিল্পের উপরে। কর্পোরেট মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যে, শ্রমের যে সর্বভারতীয় ব্যবস্থা তৈরি হয়ে উঠছে, তা থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। ভারতের সব রাজ্য চারটি শ্রম বিধি (মজুরি, শিল্প ক্ষেত্রে সম্পর্ক, কাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা) আংশিক অথবা সম্পূর্ণ মেনে নিয়েছে, কেবলমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কোনওটি মানেনি, আইন বলবৎ করার নিয়মাবলিও (রুলস) ঘোষণা করেনি। বহুজাতিক বা জাতীয় স্তরের শিল্প সংস্থাগুলিতে সাধারণত নিয়োগের শর্ত, বিরোধ নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা প্রভৃতির একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকে। কেবল একটি রাজ্যের জন্য পৃথক নিয়ম তৈরি করতে হবে, এই সম্ভাবনা বৃহৎ সংস্থাগুলিকে নিরুৎসাহ করতে পরে। এর ফলে ধাক্কা খেতে পারে রাজ্যে লগ্নি। এই সম্ভাবনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক পুরনো অবস্থানটিই ফের মনে করিয়েছেন— কেন্দ্রের শ্রমবিধি শ্রমিক স্বার্থবিরোধী, তাই রাজ্য সেগুলি মানবে না। প্রশ্ন ওঠে রাজ্যের এই নীতি-নিশ্চলতা নিয়ে। যত দিন শ্রম বিধি বলবৎ হয়নি, তত দিন শ্রমিকের স্বার্থের সুরক্ষার লক্ষ্যে তৃণমূল সরকারের আপসহীন বিরোধিতা, কেন্দ্রের সমালোচনা ও আইনের প্রতিরোধকে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে হয়তো মানা চলত, কিন্তু আইন বলবৎ হওয়ার পরে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা অর্থহীন। পুরনো শ্রম আইনগুলি খারিজ হয়ে গিয়েছে, অথচ পশ্চিমবঙ্গে নতুন চারটি শ্রমবিধি কার্যকর হতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক সুরক্ষিত থাকছে না, শিল্পও ভরসা পাচ্ছে না।
শ্রম যৌথ তালিকার বিষয়। রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী-শ্রমিকের ক্ষেত্রে রাজ্যের প্রণীত নিয়মাবলিই প্রযোজ্য। বিমানবন্দর, অর্ডন্যান্স কারখানা, ব্যাঙ্ক, বিমা, প্রভৃতি অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে সরাসরি কেন্দ্রের বিধি বলবৎ হয়েছে। এখন রাজ্য সরকার নতুন বিধিগুলি বলবৎ না করলে নানা রকম বিভ্রান্তি দেখা দেবে। তাতে শ্রমিকস্বার্থই বিঘ্নিত হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চটকল কিংবা চা বাগানে গ্র্যাচুইটি পাওয়ার জন্য আবেদন জমা করতে চাইলে তা যদি প্রচলিত নিয়ম অনুসারে জমা করা হয়, তা হলে তা খারিজ হয়ে যেতে পারে। যে-হেতু সামাজিক সুরক্ষা বিধি-র অধীনে আবেদনের নিয়মে বদল এসেছে। নিয়োগের চুক্তিপত্র যদি মজুরি কোড-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না-হয়, তা হলে পরে বিরোধ হলে আদালতে শ্রমিকই সঙ্কটে পড়তে পারেন। তেমনই, রফতানিকারকদের শ্রম আইন মেনে চলার শংসাপত্র দেখাতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের রফতানিকারকরা কোন আইন অনুসারে শংসাপত্র জমা করবেন? এমন অজস্র ছোট-বড় সঙ্কট দেখা দিতে পারে কর্মী এবং নিয়োগকারী, উভয় পক্ষের কাছেই।
অতএব রাজ্যের নিষ্ক্রিয়তা কেন্দ্র-বিরোধিতার পথ নয়। শ্রমবিধিগুলির সমালোচনা করেও শ্রমিক সুরক্ষার জন্য করার মতো কাজ রয়েছে যথেষ্ট। যেমন, কেন্দ্রের বিধিতেই রাজ্যের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেশ কিছু পরিসর রয়েছে। যেমন কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিধিতে রাজ্য যোগ করতে পারে পরিদর্শন, লাইসেন্স পাওয়ার নিয়ম, তথ্য সংগ্রহ ও প্রদর্শন, প্রভৃতি শর্ত। তেমনই, সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে রাজ্য তার নিজস্ব সুরক্ষা প্রকল্প চালু করতে পারে। এ রাজ্যে গিগকর্মী, প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের জন্য বিশেষ প্রকল্প চালু করতে পারে রাজ্য সরকার। এমনকি মজুরি বিধি বা শিল্প সম্পর্ক বিধিতে কয়েক ধরনের পরিবর্তন আনার সম্ভাবনাও রয়েছে— বিধানসভায় সংশোধন পাশ করিয়ে, কেন্দ্র থেকে সংশোধিত আইনের অনুমোদন নিয়ে আসা যায়। অতীতে শ্রম সংক্রান্ত অনেক আইনে এ ভাবে সংশোধন হয়েছে। দলীয় বিরোধিতাকে সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যসূচিতে পরিণত করার সময় এসেছে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে