আমি চাই, তোমরা বোঝো যে আমরা সবাই এই প্রাকৃতিক জগতের অংশ। যখন এই গ্রহটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে, তখনও কিন্তু এই প্রাকৃতিক জগৎ আশা হারায়নি, হারায় না। তেমনই, তোমরাও আশা হারিয়ো না।”— এই ছিল জেন গুডালের কথা। প্রবাদপ্রতিম ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ও জীববিজ্ঞানী জেন গুডালের ২০২৫ সালে অক্টোবর মাসে মৃত্যুর মাসখানেক আগে তাঁর কথাবার্তার কিছু অংশ এই ভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল সংবাদপত্রে। বিশ্ববিখ্যাত এই বিজ্ঞানী শিম্পাঞ্জিকে নিয়ে দশকের পর দশক অসামান্য গবেষণা করেছেন, প্রধানত আফ্রিকার তানজ়ানিয়া দেশে। তাঁর এই গবেষণার ফলে কেবল প্রাণিজগৎ জ্ঞানই সমৃদ্ধ হয়নি, মানুষের জগৎ বিষয়েও নতুন অনেক তথ্য ও অন্তর্দৃষ্টি মিলেছে। কারণটা অতি সহজ। আসলে জীবদুনিয়ার মধ্যে শিম্পাঞ্জির সঙ্গেই মানুষের মিল সর্বাধিক, প্রায় ৯৮ শতাংশ জেনেটিক সাদৃশ্য। তাই, কী ভাবে শিম্পাঞ্জি সামাজিক জীবন যাপন করে, সামাজিকতা বলতে সে কী বোঝে, কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের ও অন্যের জীবন— এ সব থেকে মানুষের সভ্যতা বিষয়েও অনেক ধারণা লাভ সম্ভব। শিম্পাঞ্জির জীবনেও সবটাই সুখের সময় নয়, আনন্দের সময় নয়, তাই কখনও কখনও হিংসাতেও সে প্রবৃত্ত। বর্তমান সময়ে, সমাজবিদ্যা ও মানবিকবিদ্যা দিয়ে যখন ক্রমশই মানুষকে চেনা ও জানা কঠিন হয়ে উঠছে, জীববৈচিত্রের জ্ঞানচর্চা হয়তো এ ক্ষেত্রে অনেক দূর সহায়ক হতে পারে। আশ্চর্য নয়, গত বছরের অক্টোবরে গুডালের মৃত্যুসংবাদ আসার পর থেকেই পশ্চিমি দেশগুলির মনুষ্যক্লান্ত সমাজে এই শিম্পাঞ্জি আলোচনা আবার নতুন করে সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষক হয়ে উঠছে।
গুডাল প্রথম বার একটি জরুরি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আগে মনে করা হত একমাত্র মানুষেরই পক্ষে সম্ভব যন্ত্রের ব্যবহার, আর কোনও প্রাণী তা পারে না। শিম্পাঞ্জি জগতের বিশদ ও গভীর পর্যবেক্ষণ কিন্তু বুঝিয়ে দেয়, সিদ্ধান্তটি ঠিক নয়। গাছের নীচে মাটির গর্ত থেকে পিঁপড়ে বা অন্য পোকা বার করে এনে খাওয়ার সময় সুদক্ষ ভাবে গাছের সরু ডাল কেটে হাতের মোলায়েম ঠেলায় শিম্পাঞ্জিরা খাদ্যবস্তুগুলি বার করে— এ কি যন্ত্র আবিষ্কারের প্রথম ধাপ নয়? একাধিক দৃষ্টান্ত দেখে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত পুনর্বিচার করতে চেয়েছেন: হয় মেনে নিতে হবে শিম্পাঞ্জিও মানুষ-গোত্রীয়, অথবা মানুষের বিশিষ্টতার ‘ডেফিনিশন’ বা অর্থটাকেই গোড়া থেকে পাল্টে দিতে হবে। তবে, এরা মানুষের সম-গোত্রীয় হোক বা না হোক, অত্যন্ত নিকট-গোত্রীয়, সেটা বোঝার সর্বাপেক্ষা ভাল পথ হল শিম্পাঞ্জির সমাজজীবন পরিচালনা খুঁটিয়ে দেখা। শিম্পাঞ্জিরাও নিজেদের সমাজে সকলে সকলের সঙ্গে মেশে না, যত্ন করে ছোট ছোট বৃত্ত তৈরি করে, তাদের সঙ্গেই ঘোরাফেরা, ওঠাবসা করে। আবার সেই বৃত্তের বাইরের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কটা দূরত্বের। অর্থাৎ একটি সীমিত বৃত্তের মধ্যেই চলে ঘনিষ্ঠ আদানপ্রদান। আধুনিক মানবসভ্যতায় যাকে বলা হয়, সামাজিক বুদবুদে বাস। প্রাণিজগতের মধ্যে সর্বাধিক নিকট-গোত্রীয় শিম্পাঞ্জি সমাজ বলে দিচ্ছে, এই অভ্যাস অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক, একেবারেই গা-বাঁচানোর ধান্দা নয়। গবেষণায় এও দেখা গিয়েছে যে বয়স যতই বাড়ে, শিম্পাঞ্জিদের ওই সামাজিক বলয়ও ততই ছোট হয়ে যায়। হয়তো আঘাত নেওয়ার শক্তি কমে, তাই বার্ধক্যের জন্য নিরাপদতর বলয় তৈরি করা হয়।
মানবসমাজের মতো শিম্পাঞ্জিসমাজেও সূক্ষ্ম আচারবিচার স্বভাবপ্রকৃতির তফাতের উপর নির্ভর করে তৈরি হয় ‘সংস্কৃতি’র বিভেদ, আর তার উপর নির্ভর করে সামাজিক বলয় তৈরির ধরন। সব শিম্পাঞ্জিকে দেখতে এক, কিন্তু সকলে মোটেই এক নয়। আবেগ, প্রীতি, সংবেদন অনেকের মধ্যে বেশি, অনেকে আবার অসহিষ্ণুতায় অভ্যস্ত, হিংসাপ্রবণ। ‘অপর’ ভাবাপন্ন শিম্পাঞ্জি দেখলে তারা আক্রমণ, তাড়না ও বহিষ্কারে উদ্যত হয়। গুডাল দেখিয়েছেন, আফ্রিকার গোম্বে অঞ্চলে ‘চিম্প ওয়র’ নামে এক চার বছর ব্যাপী দীর্ঘ লড়াইয়ে একটি দলের আটটি শিম্পাঞ্জি অন্য দলের ছয়টি শিম্পাঞ্জিকে তাড়িয়ে বেড়ায়, এবং শেষে তাদের মেরে ফেলে তাদের চলাচলের অঞ্চল দখল করে, তাদের মেয়ে-সদস্যদের অত্যাচার করে। নিজেদের ছায়া অন্যের মধ্যে দেখলে নিজেকে বুঝতে অনেকটা সুবিধা হয়। ঠিক সেই কারণেই শিম্পাঞ্জিসমাজ মানুষের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আরও গবেষণা হোক এই ‘চিম্প’ভুবন নিয়ে। কোন আলো কোথায় কাজে লাগবে কে জানে— বিশেষত মানবচরিত্র অনুধাবন যখন এতই দুষ্কর।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে