Sourced by the ABP
কর্মসংস্থানে দীর্ঘ সুতীব্র খরা এবং সরকারি নিয়োগে সীমাহীন দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী প্রদত্ত নতুন নীতি প্রণয়নের আশ্বাসের গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে প্রশ্নাতীত। বিরোধী নেতা থাকাকালীন তিনি বিজেপির যুব মোর্চার ‘চাকরি চায় বাংলা’ কর্মসূচিতে যোগদান করে তৎকালীন রাজ্য সরকারের ‘এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক’ তৈরি এবং সেখান থেকে চাকরি হওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। বিধানসভা নির্বাচন-পূর্বে বিজেপির ইস্তাহার রচিত হয়েছিল সেই আঙ্গিকেই। নির্বাচনী লক্ষ্যপূরণ সম্পন্ন হয়েছে। অতঃপর প্রতিশ্রুতি পূরণের পালা। মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হয়ে শুভেন্দু অধিকারীও এ-যাবৎ সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে সদর্থক পদক্ষেপের কথা বলেছেন একাধিক বার। সম্প্রতি রেল মন্ত্রক আয়োজিত রোজগার মেলা-তে তিনি জানালেন, সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা রক্ষায় নব নীতি প্রণয়নে রাজ্য বিধানসভায় আইন পাশ করা হবে। তিনি জানিয়েছেন, অতঃপর স্বচ্ছতার সঙ্গে লিখিত পরীক্ষা হবে। ওয়টস্যাপ মেসেজে নিয়োগ যেন আর না হয়।
বিগত সরকারের আমলে শিক্ষক, পুরকর্মী-সহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বিপুল দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে, তা মারাত্মক। অসাধু উপায়ে চাকরি পাওয়া শিক্ষকদের অপসারণ করতে গিয়ে আদালতের এক নির্দেশে চাকরিহারা হয়েছিলেন প্রায় ছাব্বিশ হাজার শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারী, যাঁদের মধ্যে যোগ্যরাও ছিলেন। তদুপরি, দীর্ঘ দিন বন্ধ থেকেছে স্কুলশিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা। দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও। এর ধাক্কায় প্রবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা। স্কুলে নিয়োগ-দুর্নীতি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পরীক্ষার উত্তরপত্র বা ওএমআর শিট মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কম্পিউটারের ত্রুটির কথা স্বীকার করে নিয়েছিল স্কুল সার্ভিস কমিশন। স্বীকার করেছিল কিছু ওএমআর শিটে কারচুপির অভিযোগও। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী সেই কারচুপির প্রসঙ্গেই জানিয়েছেন, এখানে ওএমআর শিট-এর কার্বন কপি পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্রের সঙ্গে জমা নিয়ে নেওয়া হয়। ঠিক এখানেই স্বজনপোষণ ও দুর্নীতির জন্ম। সমাধান হিসাবে তিনি জানিয়েছেন— পরীক্ষার্থীর হাতে উত্তরপত্রের কার্বন কপি থাকা জরুরি। আরও জানিয়েছেন, নতুন সরকার স্বচ্ছতার সঙ্গে লিখিত পরীক্ষা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতায় উপযুক্ত গুরুত্ব দিতে চায়।
কথাগুলি গুরুত্বপূর্ণ, নিঃসন্দেহে। কিন্তু মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি যে, সরকারি ক্ষেত্রে নিয়োগে দুর্নীতির বাস্তুতন্ত্রটি যেমন এক দিনে তৈরি হয়নি, ঠিক তেমনই রাতারাতি তাকে ভেঙে ফেলার কাজটিও কার্যত অসম্ভব। কারণ, তা শুধুমাত্র কোনও ব্যক্তিবিশেষের সদিচ্ছার উপরে নির্ভরশীল নয়। পশ্চিমবঙ্গে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপোষণ এবং দুর্নীতি শুধুমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের অবদান নয়— বাম আমলেও তার প্রভূত নিদর্শন মেলে। অর্থের এমন বিপুল আদানপ্রদান হয়তো ছিল না, কিন্তু চিরকুটে চাকরির অভিযোগ তখনও উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, বিবিধ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের সম্মতি অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। সেই ধারাই পরবর্তী জমানায় বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পিছিয়ে নেই বিজেপিশাসিত অন্য রাজ্যগুলিও। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারি, পর পর কয়েক বছর নিট-ইউজি পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়ম, অতি সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশে বিভিন্ন সর্বভারতীয় চাকরির পরীক্ষায় জালিয়াতির পর্দা ফাঁস তার যৎসামান্য নিদর্শন। প্রকৃতপক্ষে, দুর্নীতির সামগ্রিক কাঠামোটি বহু স্তরে বিভক্ত, প্রত্যেক স্তরেই সুবিধাভোগীরা তা থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে লাভবান হন। এবং নিজেদের স্বার্থেই তাঁরা বাস্তুতন্ত্রটিকে টিকিয়ে রাখেন। তাই তাকে ভাঙতে হলে শুধুমাত্র কিছু গ্রেফতারি এবং কিছু ঘোষণা যথেষ্ট নয়, বরং সমগ্র কাঠামোটির শিকড় ধরে টান দিতে হবে। সে কাজে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাফল্যের দিকে চোখ থাকবে সমগ্র রাজ্যবাসীর।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে