কিছু চলচ্চিত্রের এক-একটি মুহূর্ত সারা বিশ্বের দর্শকের মনে খোদাই হয়ে থাকে। তেমনই একটি মুহূর্ত— জুরাসিক পার্ক ছবিতে দুই বিজ্ঞানীর জ্যান্ত ডাইনোসর দেখা। লোকালয় থেকে বহু দূরে এক দ্বীপের খোলা সবুজ প্রান্তরে অতিকায় ব্র্যাকিয়োসরাস ঘুরে বেড়াচ্ছে, গাছের পাতা ছিঁড়ে চিবোচ্ছে, সে দৃশ্য দেখে লরা ডার্ন-অভিনীত বিজ্ঞানীর মুখ যেমন হাঁ হয়ে গিয়েছিল, তেমনই দর্শকেরও। তেত্রিশ বছর আগে জুন মাসে মুক্তি পেয়েছিল জুরাসিক পার্ক চলচ্চিত্র। সাম্প্রতিক গবেষণায় অবশ্য জানা গিয়েছে, ব্র্যাকিয়োসরাস পাতা চিবোতে পারত না— আস্ত গিলে খেত। ডিলোফোসরাস বিষাক্ত লালা ছুড়ত, জীবাশ্ম থেকে এমন প্রমাণও মেলে না। কিন্তু ভ্রান্তি যতই থাক, ছবিটি ডাইনোসরকে জাদুঘর থেকে টেনে এনেছে শোয়ার ঘরে। আজ স্কুলপড়ুয়ারাও জানে, পৃথিবীর সব পাখি আসলে ডাইনোসরদের সন্তান। বিবর্তনের ধারায় মানুষের আদিপুরুষ আসার ছ’কোটি বছর আগে যারা পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, তাদের যেন চেনাজানা পড়শি করে তুলল নতুন প্রযুক্তি, চমকপ্রদ গল্প আর অসামান্য পরিচালনা। জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের কলমে অবশ্য আগেই প্রাণ পেয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীরা— জুল ভার্নের আ জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দি আর্থ (১৮৬৪), এইচ জি ওয়েলস-এর দ্য টাইম মেশিন (১৮৯৫) থেকে শুরু করে আর্থার কোনান ডয়েলের দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড (১৯১২), নানা গল্পে প্রাগৈতিহাসিক জীবদের সঙ্গে মোলাকাত হয়েছে। এই ধারা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে সুকুমার রায় তার প্যারডি করে লেখেন ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরী’ (১৯২২), বন্দাকুশ পর্বতে এক খামখেয়ালি বিজ্ঞানী খুঁজে পান ‘হ্যাংলাথেরিয়াম,’ ‘ল্যাগ্ব্যাগর্নিস’, ‘চিল্লানোসরাস’-এর মতো আজগুবি প্রাণীদের। মাইকেল ক্রিশটনের জুরাসিক পার্ক বইটিও (১৯৯০) ‘বেস্টসেলার’ হয়েছিল। তবু স্টিভেন স্পিলবার্গের ছবিটি ডাইনোসরদের পায়ের শব্দ, চোখের দৃষ্টি, বুদ্ধিমত্তাকে এমন মূর্ত করে তুলেছিল যে তা গভীর দাগ কাটে সব সংস্কৃতিতে। কলকাতার পুজোর প্যান্ডেল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় তৈরি ভিডিয়ো গেম, সর্বত্র আবির্ভাব হয় ডাইনোসরের।
কিন্তু সেই উত্তেজনার পাশাপাশি এক নৈতিক প্রশ্নও তুলেছিল ছবিটি— জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিং-এর সাহায্যে বিলুপ্ত প্রাণীকে ফিরিয়ে আনা কি উচিত? জৈবপ্রযুক্তি মানুষের হাতে যে ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে, তার অকল্পনীয় ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, কারণ যে কোনও মুহূর্তে নিজের সৃষ্টির উপরে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে মানুষ। জুরাসিক পার্ক সেই বার্তা দিয়েছিল। জেফ গোল্ডবম-অভিনীত বিজ্ঞানীর চরিত্রটি ছবিতে বলে একটি মনে রাখার মতো কথা — “প্রাণ সব সময়েই পথ খুঁজে নেয়” (লাইফ অলওয়েজ় ফাইন্ডস আ ওয়ে)। নিজেকে বিচিত্র উপায়ে প্রকাশ করাই প্রাণের ধর্ম, তাই কৃত্রিম উপায়ে ডাইনোসরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও শেষ অবধি ডাইনোসররা প্রজনন করেছিল, তারাই নিয়েছিল দ্বীপের অধিকার। ‘ক্রিসপর’-এর মতো প্রযুক্তি আসার পরে জিন ‘এডিটিং’ করা আরও সহজ হয়ে উঠেছে। কল্পবিজ্ঞান এগোচ্ছে বাস্তবের দিকে— ‘উলি ম্যামথ’-সহ কিছু বিলুপ্ত প্রাণী তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে একটি বেসরকারি সংস্থা। পরিবেশজগতে তার প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এমনকি জিন পরিবর্তন করে নতুন ধরনের ফসল তৈরির মধ্যেও রয়ে গিয়েছে এই ঝুঁকি। বাস্তুতন্ত্র এতই জটিল এবং সূক্ষ্ম যে এই ধরনের পরিবর্তনের কী প্রভাব পড়বে তার উপরে, তা আগাম বলা অসম্ভব।
কৃত্রিম মেধার দ্রুত উন্নতির ফলে আশঙ্কা আরও ঘনিয়ে এসেছে, কারণ কৃত্রিম মেধা-পরিচালিত জৈবপ্রযুক্তি অসীম ক্ষমতা রাখে কৃত্রিম ডিএনএ তৈরি করার। ক্রিসপর প্রযুক্তিকে অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে ব্যবহার করে তৈরি করতে পারে জীবনের নতুন নতুন ‘কোড’। সম্প্রতি বিজ্ঞান, জৈবপ্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য জগতের শীর্ষ ব্যক্তিরা সারা বিশ্বের প্রশাসকদের কাছে আবেদন করেছেন কৃত্রিম মেধা-পরিচালিত জৈবপ্রযুক্তির প্রয়োগে রাশ টানতে। প্রশ্ন হল, আইন করলেও সকলে তা মানবে কি? অর্থ, যশ, নতুন সৃষ্টির নেশা কিছু মানুষকে চিরকালই ঠেলে নিয়ে গিয়েছে অ-সম্ভবের কিনারায়। নৈতিকতা, বিধি-নিষেধ সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি অতীতে, ভবিষ্যতেও পারবে কি? ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানবের মতো মানুষের সৃষ্টি ফিরে আসে স্রষ্টাকে ধ্বংস করতে। ছবির শেষ দৃশ্যে এক দাম্ভিক উদ্যোগপতির স্বপ্নের পর্যটন কেন্দ্র ‘জুরাসিক পার্ক’ ধ্বংস করে যখন বিজয়োল্লাসে গর্জন করে টি-রেক্স, তখন দর্শকের কাছে স্পষ্ট হয় সেই সত্য।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে