লড়াই চলছে ২০২৩ সাল থেকেই। নিজেদের জীবন-জীবিকা-বিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখার লড়াই, জমিকে বহুজাতিক সংস্থার গ্রাস থেকে সুরক্ষিত রাখার লড়াই। সেই বছরেই ওড়িশা সরকার রায়গড়া এবং কালাহান্ডি জেলার এক বিরাট অংশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সিজিমালির বক্সাইট খনিটিকে তুলে দেয় এক বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর হাতে। এই প্রকল্প এলাকায় আনুমানিক ৩০ কোটি টনেরও বেশি উচ্চমানের বক্সাইট সঞ্চিত আছে। স্বাভাবিক ভাবেই সরকার এবং শিল্পপতি গোষ্ঠীর নজর পড়েছে তাতে। কিন্তু, এই জমি দলিত এবং জনজাতি সম্প্রদায়েরও ঠিকানা, যাঁরা এই জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল। সিজিমালি লাগোয়া গ্রামগুলির সদস্যরা একজোট হয়ে ২০২৩ সালেই দাবি তুলেছিলেন, ওই সংস্থাকে দেওয়া খনির ইজারা বাতিল করা হোক। কারণ, এই প্রকল্প পরিবেশগত ছাড়পত্র পেলে তাঁরা নিজেদের বাসভূমি, অরণ্য, এবং নদীর অধিকার থেকে সম্পূর্ণ ভাবে বঞ্চিত হবেন। সেই প্রতিবাদই এই বছর আরও জোরালো হয়েছে। এপ্রিলের গোড়ায় বক্সাইট খনির সংযোগকারী রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে পুলিশের তীব্র সংঘর্ষে উভয় পক্ষেই জখম হয়েছেন অনেকে।
এর পরেও জনজাতিভুক্তদের ক্ষোভ, প্রতিবাদের পরোয়া করেনি সরকার। বরং কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এক রেল করিডরের কথা জানানো হয়েছে সিজিমালি এবং কুত্রুমালি খনির জন্য। আধিকারিকরাও স্পষ্ট করেছেন, এই বিশেষ রেল প্রকল্পের উদ্দেশ্যই খনিজ উত্তোলনকে জোরদার করা। এই পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত নয়। ২০২৩ সালের বন সংরক্ষণ আইনের নতুন সংশোধনের মধ্যেই তার আভাস মিলেছিল। এই আইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তা অরণ্যের সংজ্ঞাকে সঙ্কীর্ণ করেছে, জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলির দরজা শিল্পগোষ্ঠীদের কাছে মুক্ত করে দিয়েছে। সংশোধনের মাধ্যমে ২০০৬ সালের তফসিলি জনজাতি এবং অরণ্যে বসবাসকারী মানুষদের অরণ্য অধিকার আইনকেও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামসভার অগ্রিম অনুমতি ছাড়াই বেসরকারি সংস্থার অরণ্যে প্রবেশের পথটি উন্মুক্ত হবে। যদিও, কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, এর মূল উদ্দেশ্য সরকারি-বেসরকারি মিলিত উদ্যোগে জঙ্গলের নষ্ট হয়ে যাওয়া জমিতে নতুন করে অরণ্য সৃষ্টি, কিন্তু সাম্প্রতিক নিকোবর, সরিস্কা, উত্তরাখণ্ডের উদাহরণ দেখে সেই আশ্বাসবাণীতে ভরসা রাখা কঠিন।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, এই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে অভিযোগ উঠেছিল যে, তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে পরিবেশ আইন শিথিল করার যাতে অনৈতিক ভাবে বাড়তি খনিজ তোলা যায় বা কোনও এলাকায় তেলের কূপ খননের জন্য স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে আলোচনা করার মতো নিয়মের হাত থেকে রেহাই মেলে। অভিযোগ সত্য হলে বন সংরক্ষণ আইনের সংশোধনের পরিপ্রেক্ষিতটি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ২০১৩ সালে এই একই সংস্থা এবং ওড়িশা সরকারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে এক ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল ওড়িশার ডোঙ্গরিয়া কন্ধ জনজাতিভুক্ত মানুষরা। পবিত্র নিয়মগিরি পাহাড় রক্ষায় তাঁদের অধিকার মান্যতা পেয়েছিল। কিন্তু তার পরেও তাঁদের উচ্ছেদ হওয়া, হেনস্থা ঠেকানো যায়নি। সিজিমালির ভবিষ্যৎ এখন সঙ্কটে নিমজ্জিত।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে