অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি গ্রামীণ ভারতের শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও বনিয়াদি শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডস্বরূপ। পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী মায়েদের পুষ্টির দিকটিতেও নজরে রাখা হয় এখানে। ওড়িশার নুয়াগাঁও গ্রামের অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে ৪২টি শিশু ও স্তন্যদায়ী মায়ের পরিচর্যার ব্যবস্থা আছে, ২০টি শিশুর কেন্দ্রে আসার কথা, বাকিরা ছোট, রেশনে বরাদ্দ খাবার তাদের পরিবার নিয়ে যায়। গত তিন মাস এই কেন্দ্র কার্যত অচল ছিল, শিশুদের উপস্থিতির হার ছিল শূন্য, রেশন নেওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, ২০ নভেম্বর এক দলিত স্নাতক তরুণীকে রাঁধুনি ও সহায়িকা পদে নিয়োগের পর তথাকথিত উচ্চবর্ণের গ্রামবাসীরা শিশুদের ওই কেন্দ্রে পাঠানো বন্ধ করে দেন। তরুণী ও তাঁর পরিবারকে অপমানিত, একঘরেও হতে হয়। দলিত শ্রেণিভুক্ত মানুষের রাঁধা ও ছোঁয়া খাবার গ্রহণে অন্যেরা অসম্মত, কারণ অনুমান কঠিন নয়, বর্ণবৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার ব্যাধি যা একুশ শতকের ভারতেও নানা বেশে বিরাজমান। বিষয়টি সংসদে উত্থাপিত হয়, জেলা প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ আলোচনা, সচেতনতামূলক প্রচার ও দৃষ্টান্তস্বরূপ নানা পদক্ষেপ করার পরে ১৫ জন শিশু কেন্দ্রে ফিরে এসেছে, রেশন নিতেও সম্মত হয়েছে অন্য পরিবারগুলি।
এই মীমাংসায় প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা প্রশংসনীয়। প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও সদিচ্ছা থাকলে এ-হেন অর্গলও তা হলে ভাঙা যায়। গ্রামবাসীদের এমন দলবদ্ধ, এককাট্টা প্রতিরোধের সামনে সাধারণত কর্তৃপক্ষকে আপসের পথ নিতেই দেখা যায়। কিন্তু এখানে শান্তি বজায়ের অভিপ্রায়ে বৈষম্যকে চলতে দেওয়া হয়নি, যাঁকে নিয়ে আপত্তি তাঁকে বদলি করে বা বিষয়টিকে লঘু করে ধামাচাপা দিয়ে কোনও নীরব সমঝোতার চেষ্টাও হয়নি। বরং, প্রশাসন পথের সন্ধানে ব্যগ্র হয়ে শিশু সুরক্ষা কমিশন ও মহিলা কমিশনের প্রতিনিধি-সহ দলকে পাঠিয়েছে গ্রামে, বৈঠক হয়েছে, সর্বতোভাবে সচেতনতার প্রচার করার চেষ্টা হয়েছে। এই বৈষম্য যে বেআইনি স্পষ্ট জানিয়ে প্রয়োজনে ব্যবস্থা করার বার্তাও যেমন দেওয়া হয়েছে, তেমনই কর্মকর্তারা রান্না করা খাবার খেয়ে প্রকাশ্যে তরুণীর পাশে দাঁড়ালে তা গ্রামবাসীর চোখ খুলে প্রজন্মলালিত মনের বাধা দূরীকরণে সহায়ক হয়েছে।
খবরটি আশাপ্রদ, তবু একই সঙ্গে লজ্জাজনকও বটে। গ্রামে গ্রামে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রকল্পে অনগ্রসর শ্রেণিভুক্তদের নিয়োগ করলে বয়কট, বিদ্বেষ, সামাজিক ভাবে একঘরে করে তীব্র বিরোধিতা পরিচিত ঘটনা। সংবিধানের সাম্যের অধিকার স্বীকৃত। জাতের ভিত্তিতে বৈষম্য ও অপমান বেআইনি। তবু, এখনও ধারাবাহিক ভাবে সমাজের রীতিনীতি ও অভ্যাসের কারণে এই বিদ্বেষ মান্যতা পেয়েই চলেছে, এবং সন্দেহ হয়, কিছু জায়গায় বেড়েও চলেছে। বৈষম্য এখন রাজনীতির প্রত্যক্ষ প্রকরণ। স্পষ্টতই, এতে শুধু কিছু মানুষের মর্যাদা, অধিকারের হানিই হচ্ছে না, জনস্বাস্থ্য বিপন্ন হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের মনে শৈশব হতেই বিদ্বেষের বীজ বপন করা হচ্ছে। এই বিভাজন শেষ করতে রাষ্ট্রকে দৃঢ় ও কঠোর পদক্ষেপ করে চলতে হবে— যা সাধারণত করা হয় না বর্তমান ভারতে। একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম, শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমেই সমাজের মনোভাবের আমূল সংস্কার সম্ভব। শুধু নথিপত্রে ঘোষণা যথেষ্ট নয়, গণতন্ত্রে আচার ও আচরণই মূল।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে