Jammu and Kashmir

রঞ্জির স্বপ্নে এক জম্মু ও কাশ্মীর

বাংলার মাটিতে বাংলাকে হারিয়ে রঞ্জি সেমিফাইনালে গত কালের জয় যতটা বারামুলার আকিব নবির, ততটাই কালাকোটের আব্দুল সামাদ, ডোডার আবিদ মুস্তাক কিংবা জম্মুর বংশরাজ শর্মা, সুনীল কুমারের।

সাবির ইবন ইউসুফ

শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৪
Share:

—প্রতীকী চিত্র।

মাঝে মাঝে দেওয়ালগুলো ভাঙার সময় আসে। না-হলে দেওয়াল আপনিই ভাঙে, পারস্পরিক আনন্দ আর গর্বের ঢেউয়ে। গত কাল থেকে তেমনই ঢেউ নেমেছে জম্মু থেকে কাশ্মীরে। ৬৭ বছরের লম্বা পথ এখন স্বপ্নের দোরগোড়ায়। আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম বার রঞ্জি ট্রফির ফাইনাল খেলবে জম্মু-কাশ্মীর।

বাংলার মাটিতে বাংলাকে হারিয়ে রঞ্জি সেমিফাইনালে গত কালের জয় যতটা বারামুলার আকিব নবির, ততটাই কালাকোটের আব্দুল সামাদ, ডোডার আবিদ মুস্তাক কিংবা জম্মুর বংশরাজ শর্মা, সুনীল কুমারের। মোক্ষম বলেছেন ডিজিপি কুলদীপ সিংহ খোড়া, ‘‘আমাদের ছেলেরা যখন খেলতে নামে, কেউ জিজ্ঞাসা করে না, কে জম্মুর আর কে কাশ্মীরের? ওরা সবাই একই টিমের প্রতিনিধি।’’ সমাজমাধ্যম ভরে যাচ্ছে শুভেচ্ছাবার্তায়। কোনওটা কাশ্মীরিতে লেখা, কোনওটা ডোগরি বা উর্দুতে। জম্মুর বাসিন্দাদের মতো কাশ্মীর উপত্যকার ক্রিকেটপ্রেমীরাও কাল নামেন রাস্তায়। জ্বলে আতশবাজিও।

অথচ মাত্র মাস দেড়-দুই আগেও জম্মুর রিয়াসিতে মাতা বৈষ্ণো দেবী মেডিক্যাল কলেজের ৫০টি আসনের মধ্যে ৪২টিতে মুসলিম ছাত্রছাত্রীরা সুযোগ পাওয়ায় ঝান্ডা হাতে নেমে পড়েছিল একাধিক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। শেষ পর্যন্ত সেই মেডিক্যাল কলেজের অনুমোদন বাতিল হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির খেসারত দিতে হল প্রতিষ্ঠানটিকে। এমনকি জম্মু-কাশ্মীরের অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট টিম ও সন্তোষ ট্রফি ফুটবল টিমেও কাশ্মীরি মুসলিমদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। নতুন আইন বিশ্ববিদ্যালয় জম্মুতে হবে না কাশ্মীরে, দড়ি-টানাটানি চলেছে তা নিয়েও। স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, কেন্দ্রের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের ফলে জম্মু-কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে টানাপড়েন বেড়ে চলেছে।

পারস ডোগরার বাহিনী রঞ্জি ফাইনালে ওঠার পরে সেই সব ফাটল যে চিরতরে বুজে গেল এমন নয়, কিন্তু আপাতত আঞ্চলিক পরিচয়কে সরিয়ে রেখে ক্রিকেটপ্রেমীরা তাঁদের টিমের পাশে মনে-মনে একজোট। কারণ, টিমটাও একজোট। সেমিফাইনালে কাশ্মীরের আকিবের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়েই বাংলার ব্যাটিংকে ভেঙেছেন জম্মুর পেসার সুনীল কুমার। ঘরের মাটির রাজনৈতিক টানাপড়েন তাঁদের ছুঁতে পারেনি। জম্মুর প্যারেড গ্রাউন্ড এলাকার দোকানদার রমেশ গুপ্ত গত কাল শুধুই যে নিজের সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে আনন্দে মেতেছিলেন, এমন নয়। বলছিলেন, ‘‘কোথায় কোন প্রতিষ্ঠান হবে, কে কী পাবে, এ নিয়ে বছরের পর বছর তর্ক চলছে। কিন্তু এ বার আমরা খালি বাউন্ডারি আর উইকেট চেয়েছি।’’ তেমনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমির নাজ়ির বললেন, ‘‘অধিনায়ক যখন ব্যাট তোলে, তাতে আমাদের সকলের স্বপ্নই লেখা থাকে। শুধু জম্মু বা শুধু কাশ্মীর থাকে না।’’ শ্রীনগরের সমাজতত্ত্ববিদ নুজ়হত মিরের কথায়, ‘‘আমাদের বিভিন্ন জেলার বৈচিত্র, বিভিন্ন ভাবে বেড়ে ওঠা মানুষের এক জার্সিতে প্রতিফলন এই টিম।’’

শিক্ষাবিদ ফারুক আহমেদ বলছিলেন, ‘‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রাতারাতি তৈরি হয় না। কিন্তু এক আনন্দের শরিক হওয়াটা কাজে দেয়। তাতে হৃদয় কোমল হয়, আলোচনার দরজা খোলে।’’ নুজ়হত মির আবার মনে করেন, সংলাপও যা পারে না, ক্রিকেট তা পারে। গত কালের ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল মনে করিয়ে দিয়েছে, মতবিরোধের চেয়ে মিলিত প্রত্যাশার জোর বেশি। কিছু নাগরিক সমাজ ঠিকই করে ফেলেছে, ঘরে ফিরলে সংবর্ধনা দেওয়া হবে ক্রিকেট টিমকে। কেএল রাহুলদের বিরুদ্ধে ফাইনালের ফলাফল যা-ই হোক।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন