মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল চিত্র।
পরাজয়ের এক মাসের মাথায় তৃণমূল কংগ্রেস দলটি কার্যত উঠে গেল। দীর্ঘ দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর, তাসের ঘরকেও লজ্জা দেওয়ার গতিতে সদ্য-প্রাক্তন শাসক দলের এমন অতিদ্রুত পতন ও মূর্ছা— ভারতের ঘটনাবহুল রাজনৈতিক ইতিহাসেও অভূতপূর্ব। অবশ্য, গতিবেগে বিস্ময় জাগলেও মূল ঘটনায় বিস্ময়োদ্রেকের কোনও অবকাশ নেই। এক দিক দিয়ে এই ভাঙন প্রায় প্রত্যাশিতই ছিল, কারণ তৃণমূল দলটি কোনও একটি আদর্শকে কেন্দ্র করে গঠিত বা চালিত, এমন দাবি দলের কট্টর সমর্থকরাও করতে পারতেন না। দলের বাঁধুনি ছিল মাত্র দু’টি— এক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামক নেত্রীর প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য। এবং দুই, শাসক পক্ষ হওয়ার দরুন দুর্নীতির অবাধ ছাড়পত্র। দ্বিতীয় কারণটি নির্বাচনী পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বিলুপ্ত হয়েছে; কিন্তু বিশেষ উল্লেখ্য প্রথম কারণটিও কতখানি তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই প্রসঙ্গে আরও এক বার ‘রাজনীতিহীন’ রাজনীতির বিপদের কথাটি মনে করা বিধেয়— শুধু তৃণমূল নামক অধুনা বিলুপ্তপ্রায় দলটির জন্য নয়, বরং রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতির স্বার্থে। রাজনীতি যখন শুধুমাত্র লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক বা ব্যক্তিবাদের ভিত্তিতে সংগঠিত হয়, তবে তা পদ্মপাতায় জলের চেয়েও অস্থিতিশীল। প্রাত্যহিকতার ঊর্ধ্বে কোনও একটি আদর্শ বা অভিমুখ দরকার, কোনও নীতি বা লক্ষ্যের ভাবনা দরকার— সেই লক্ষ্য/আদর্শের চরিত্র যেমনই হোক না কেন। আশ্চর্য যে তৃণমূল কংগ্রেসের কান্ডারি নেত্রী দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের রাজনীতিকালে ও পনেরো বছরের শাসনকালে আদৌ বুঝতেই পারেননি এমন কোনও অভিমুখের প্রয়োজন। ভেবেছিলেন প্রাত্যহিক দেনাপাওনার হিসাবেই সব অঙ্ক মিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর/তাঁদের কব্জায়।
সুতরাং, এই ভাঙনের পিছনে ক্ষমতা হারানো, এবং তার ফলে এত দিন ধামাচাপা দিয়ে রাখা দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের বিস্ফোরক ভূমিকা প্রখর রকমের স্পষ্ট। কিন্তু, তারও চেয়ে গুরুতর ভূমিকা— দলের দুই শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ‘পিসি-ভাইপো’ অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ঘটনা হল, রাজ্য রাজনীতিতে অভিষেকের প্রবেশ তৃণমূলের শাসনকালে, পিতৃস্বসার বদান্যতায়, কোনও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়া, কোনও জনভিত্তি ছাড়া। এই ভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন দলের যুবরাজ— দলের প্রবীণ নেতাদেরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাঁর দফতরে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হত। দলীয় জননেতাদের অগ্রাহ্য করে যাঁর কর্পোরেট ভঙ্গিতে দল চালানোর নামে সংগঠন কব্জা করার চেষ্টাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবাধ প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন। সবচেয়ে আশ্চর্য, নির্বাচনে এ-হেন ভরাডুবির পরও দলের জয়ী বিধায়কদের— সমর মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণ নেতাকেও— মমতা বাধ্য করেছেন অভিষেকের সম্মানে উঠে দাঁড়াতে। জানিয়েছেন, অভিষেককে প্রশ্ন করলেই দল থেকে ঘাড়ধাক্কা দেওয়া হবে। একদা অভিষেকের পিসির খ্যাতি ছিল, রাজনীতির নাড়ির গতি বোঝার ক্ষেত্রে তিনি দক্ষ— গত কয়েক বছরে তিনি সেই দক্ষতা নিজ হাতে আদিগঙ্গার ঘোলা জলে বিসর্জন দিয়েছেন। দল যে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, সে কথা বুঝতে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে, তৃণমূলের এই ভাঙনের পিছনে নেতৃত্বের দায়ই সর্বাধিক, সন্দেহ নেই।
লক্ষণীয়, এখন যাঁরা বিদ্রোহী হলেন, তাঁদের অধিকাংশেরই উত্থান ২০১১ সালের পর। ফলে, ক্ষমতায় না থেকে রাজনীতি করার শিক্ষা, অভিজ্ঞতা বা অভিলাষ, কোনওটিই তাঁদের নেই। শাসক না হতে পারেন, অন্তত শাসক-পোষিত বিরোধী হয়ে উঠতে তাঁদের আগ্রহ উদগ্র। ফলে এটিই এখন ‘বেঙ্গল মডেল’— যেখানে শাসকের পাশে বিরোধীও আসলে শাসক-পোষিত। গণতন্ত্রের এই ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে দাঁড়িয়েছে এই রাজ্য, এই দেশ। এবং, বিরোধী নেত্রী হিসাবে শাসকের ঘুম কেড়ে নেওয়ার খ্যাতি ছিল যাঁর, তাঁরই নাম ইতিহাসে খোদিত হল এই বিপন্নতা তৈরির দায়ে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে