বহু আড়ম্বর করে যে সব বিপুল বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়, বছর ঘুরলে দেখা যায় তার একটা বড় অংশ থেকে গিয়েছে সরকারের তহবিলে, মানুষের কাজে লাগেনি। খরচের এই দৈন্যের চিত্র শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ নানা সামাজিক ক্ষেত্রে স্পষ্ট। এ বারের কেন্দ্রীয় বাজেটের পর্যালোচনায় ফের স্পষ্ট হল ফাঁকির অঙ্ক। একটি উদাহরণ, কেন্দ্রের শ্রম ও নিয়োগ মন্ত্রকের বরাদ্দ এ বছর (২০২৬-২৭) ছাড়িয়ে গিয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা এ-যাবৎ সর্বাধিক। তাতে আনন্দিত হওয়া যেত, যদি না দেখা যেত যে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে শ্রম, নিয়োগ এবং দক্ষতা তৈরির জন্য যে ২৮ হাজার কোটি টাকা ধার্য হয়েছিল, তা থেকে খরচ হয়েছে কেবল ১০ হাজার কোটি টাকা! যে সব কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বরাদ্দ টাকা প্রায় কিছুই খরচ হয়নি, তার মধ্যে রয়েছে জাতীয় শিশু শ্রম প্রকল্প, দলিত-আদিবাসী এবং ওবিসি-দের জন্য বিশেষ কোচিং-এর ব্যবস্থা, শ্রমিকদের নথিভুক্তির ব্যবস্থা, ইত্যাদি। চাহিদা তীব্র, টাকাও রয়েছে, কিন্তু তা কাজে লাগেনি। এ বছর শ্রম বাজেটের সিংহভাগ (২০ হাজার কোটি টাকা) পেয়েছে একটি নতুন প্রকল্প— প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত রোজগার যোজনা। উদ্দেশ্য, সব স্তরে কাজ তৈরি করা, সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাকে মজবুত করা, প্রভৃতি। আশঙ্কা জাগে, এ ধরনের প্রকল্পের টাকার নাগাল যাতে সাধারণ মানুষ পায়, রাজ্য এবং কেন্দ্রের উদ্যোগে সে ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে কি? কোভিড-কালে ঘোষিত ‘আত্মনির্ভর ভারত যোজনা’-সহ নানা প্রকল্পের টাকা সম্পূর্ণ খরচ করা যায়নি, প্রকল্পের সময়সীমা বাড়িয়েও।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় এই যে, কিছু প্রকল্পে বরাদ্দ খরচের হার আগের তুলনায় কমেছে। ২০২৩-২৪ সালে শহরাঞ্চলে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার জন্য বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা, খরচ হয়েছিল ২১ হাজার কোটি টাকা। সেখানে ২০২৫-২৬ সালে বরাদ্দ ২৬ হাজার কোটি টাকা থেকে খরচ হয়েছে মাত্র ৭৮০০ কোটি টাকা। সংসদীয় কমিটির প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রের আবাস এবং নগর বিষয়ক মন্ত্রক (এমওএইচইউএ) জানিয়েছে যে, রাজ্যগুলি টাকা চেয়ে পাঠাচ্ছে না বলে বরাদ্দ খরচ হচ্ছে না। তেমনই, ২০২৩-২৪ সালে জল জীবন মিশনে বরাদ্দ ৭০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৬৯ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছিল, সেখানে ২০২৫-২৬ সালে ৬৭ হাজার কোটি টাকার থেকে খরচ হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় শিক্ষার বরাদ্দ ব্যবহারে ব্যর্থতা। ভারতের স্কুল-শিক্ষায় যখন বিপুল সঙ্কট চলেছে, ড্রপ আউট বাড়ছে, তখন স্কুল-শিক্ষা খাতে সাত হাজার কোটি টাকা খরচ না-হয়ে পড়ে রয়েছে, এটা সারা দেশের লজ্জা। কেন্দ্র এবং বিভিন্ন রাজ্যের সরকারগুলি পরস্পরের উপর দোষারোপ করে দিন কাটাচ্ছে। তাই বাজেট-নথি দেখলে সংশয় জাগে, জনমুখী প্রকল্পে বড় বড় অঙ্কের ঘোষণা কি তবে কেবল দলীয় রাজনীতির আস্ফালন? সরকারের নীতির প্রতিফলন বলে তাকে আর ধরা চলে না?
গত কয়েক বছরে বেতন, পেনশন, ভর্তুকি এবং সামাজিক ক্ষেত্রের জনসুবিধা প্রকল্পগুলির খরচ কমিয়ে বাজেট-ঘাটতি কমানোর ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একটি আন্দাজ, বিভিন্ন জনকল্যাণ প্রকল্প-সহ বেশ কিছু কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বরাদ্দ টাকার অতি সামান্য খরচ হওয়ার জন্য এ বছর কেন্দ্রীয় সরকার ৭৫ হাজার টাকা অবধি বাঁচিয়েছে। তাতে বাজেটে ঘাটতি হয়তো কমেছে, কিন্তু উন্নয়নের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে কি? পরিকাঠামো নির্মাণ, ঘরে ঘরে নলবাহিত পানীয় জল সরবরাহ, শহর ও গ্রামে দরিদ্রের পাকা বাড়ি নির্মাণ, গ্রামীণ সড়কব্যবস্থার উন্নতি, শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষা প্রভৃতির চাহিদা না মিটিয়ে টাকা ফেলে রাখাকে ‘টাকা বাঁচানো’ বলা চলে না। দেশের মানুষের সুস্থ জীবনের অধিকার তাতে বাঁচবে না। বাজেটে কত বরাদ্দ হচ্ছে, আর প্রকৃত খরচের পরিমাণ কত, এই অঙ্ক দু’টি দেখে তার মধ্যে ফারাকের পরিমাণকে রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করার দায়িত্বটি বিরোধীরা পালন করবেন কি?
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে