—প্রতীকী চিত্র।
ধনকুবেররা দাবি করছেন, তাঁদের উপর আরও বেশি করে কর চাপানো হোক, এ কথা শুনে সহসা বিশ্বাস হতে চায় না। এমন আশ্চর্য ঘটনা দিয়েই এ বছর দাভোস-এর ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম শুরু হল। চব্বিশটি দেশের প্রায় চারশো ‘মিলিয়নেয়ার’ (দশ লক্ষ বা তার বেশি আমেরিকান ডলারের মালিক) একটি খোলা চিঠিতে বলেছেন, অতিধনীদের সঙ্গে বাকিদের সম্পদের ফারাক বেড়েই চলেছে, তাতে বিশ্ব চলে এসেছে সঙ্কটের একেবারে কিনারায়। সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের হাতে এখন যত সম্পদ রয়েছে, তা বিশ্বের ৯৫ শতাংশ মানুষের চেয়ে বেশি। এই ব্যবধান প্রতি দিন বেড়েই চলেছে, দেশের মধ্যে, এবং প্রজন্মের মধ্যে। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক অসরকারি সংস্থা তার প্রতিবেদনে (‘রেজ়িস্টিং দ্য রুল অব দ্য রিচ: প্রোটেকটিং ফ্রিডম ফ্রম বিলিয়নেয়ার পাওয়ার’) দেখিয়েছে যে, কেবল ২০২৫ সালেই বিলিয়নেয়ার (একশো কোটি ডলারের মালিক) ব্যক্তিদের সম্পদ বেড়েছে ১৬ শতাংশ। বৃদ্ধির এই হার নজিরহীন। একই সময়কালে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্রে বাস করছেন। উপরন্তু, অতিধনীরা বিশ্বের সর্বত্র নিজেদের লাভ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অর্থনীতির নিয়ম বদলাচ্ছেন। তাতে সাধারণ মানুষের অধিকার এবং স্বাধীনতার হানি হচ্ছে। প্রায় একই সুরে ‘জেতার সময়’ (টাইম টু উইন) শিরোনামের চিঠিটিতে চারশো জন মিলিয়নেয়ার রাজনীতি এবং অর্থনীতির নেতাদের লিখছেন। চিঠির বক্তব্য, মাত্র কয়েক জন অতিধনী মানুষ তাঁদের অতিরিক্ত সম্পদ দিয়ে গণতন্ত্র কিনে নিচ্ছেন, প্রশাসনকে কুক্ষিগত করছেন, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছেন, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের সম্ভাবনা সঙ্কীর্ণ করছেন, দারিদ্রকে গভীরতর করছেন, গ্রহকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ফলে ধনী এবং গরিব, সব মানুষের কাছেই যা মূল্যবান, সে সব ক্ষয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বের নেতাদের কাছে বিবেকবান ধনীদের দাবি, গণতন্ত্রকে ফিরে পেতে, ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হলে, আর সময় নষ্ট না-করে অতিধনীদের উপর কর বসানো দরকার। চিঠিতে বলা হয়েছে, অতিধনীদের উপর কর বসালে শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করার জন্য টাকা জোগানো সম্ভব। এ বিষয়েও একটা পরিষ্কার হিসাব দেখিয়েছে অসরকারি সংস্থাটির প্রতিবেদন— কেবল এক বছরে যে বাড়তি টাকা গিয়েছে অতিধনীদের কাছে (আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার) তা দিয়ে সারা বিশ্ব থেকে অতিদারিদ্র মুছে ফেলা সম্ভব— এক বার নয়, ছাব্বিশ বার। অসাম্যের এই প্রবলতার সামনে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করা যায়, অতিধনীদের একাংশ যে আরও বেশি কর দিতে চাইছেন, তা কেবল দরিদ্রের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শনের ইচ্ছাতে নয়। ক্রমবর্ধমান অসাম্যের ফলে বিশ্বের অর্থনীতি এক বেসামাল অবস্থায় চলে গিয়েছে, যার ফলে আখেরে প্রত্যেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অপূরণীয় ক্ষতি হবে পরিবেশ-প্রতিবেশিতার, সেই বোধ কাজ করছে তাঁদের মধ্যে।
কিন্তু এই অনুরোধ মেনে ধনীদের উপর কর বাড়ানোর সাহস কোনও দেশের হবে কি? সম্প্রতি সুইৎজ়ারল্যান্ডে অতিধনীদের উপর উত্তরাধিকার কর বসানোর বিষয়ে জনমতদানের ব্যবস্থা হয়েছিল। কিছু অতিধনী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, এই আইন পাশ হলে তাঁরা অন্যত্র চলে যাবেন। জনমত যায় প্রস্তাবের বিপক্ষে, ফলে ধনীরা রেহাই পেয়েছেন। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতেও ‘বিলিয়নেয়ার ট্যাক্স’ আনার প্রস্তাব এসেছে, যাতে অতিধনীদের এক বার এককালীন ৫ শতাংশ কর দিতে হবে। সেই টাকা দিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার হবে, ঘোষণা করেছে ক্যালিফোর্নিয়ার সরকার। সে রাজ্যের প্রায় আড়াইশো বিলিয়নেয়ারের মধ্যে অনেকেই অবশ্য অন্যত্র যাওয়ার রাস্তা খুঁজছেন। অনেকে মনে করাচ্ছেন, করের হার যা-ই হোক, রাজকোষের অর্থ অধিকাংশই আসে ধনীদের থেকে। তাঁরা সরে গেলে সরকারেরই ক্ষতি। বিবেক বনাম ব্যক্তিস্বার্থের লড়াই সহজে থামার নয়।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে