পশ্চিম দিকের দরজায় তিন বার ঠুকঠুক শব্দ। কে?— ক্যাথিড্রালের ভিতর থেকে প্রশ্ন স্থানীয় এক দল স্কুলপড়ুয়ার। দরজার ও-পারে, বাইরে থেকে উত্তর এল: “আমি ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ হয়ে তোমাদের সেবা করতে এসেছি, এসেছি জিশু খ্রিস্টের ভালবাসা ঘোষণা করতে, তোমাদের সঙ্গে নিয়ে তাঁকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতে, তাঁর আরাধনা করতে।” ক্যাথিড্রালের দরজা প্রথামাফিক খুলে গেল এর পর, সঙ্গে ইতিহাসের সিংহদুয়ারও: অ্যাংলিকান চার্চ তথা ‘চার্চ অব ইংল্যান্ড’-এর প্রায় পনেরোশো বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অধ্যাত্মগুরু ‘আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবেরি’ পদে এই প্রথম বসলেন এক নারী— সারা মুলালি। ষষ্ঠ শতকের শেষ দিকে পোপ প্রথম গ্রেগরি অ্যাংলো-স্যাক্সনদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারে ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন সন্ত অগাস্টিনকে, ক্যান্টারবেরিতে ক্যাথিড্রাল গড়ে তিনিই হন প্রথম আর্চবিশপ। তার পর টেমস দিয়ে নানা পরিবর্তন-বিবর্তনের জল বয়েছে, ষোড়শ শতকে ‘রিফর্মেশন’-এ চার্চ অব ইংল্যান্ড সরে গেছে রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে, এবং ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় প্রধান রাজা বা রানির সমান্তরালে ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ হয়ে উঠেছেন ধর্মজগতের শীর্ষ। এই সুদীর্ঘকালে যে শতাধিক ব্যক্তিত্ব এই পদে বসেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই পুরুষ, চার্চ অব ইংল্যান্ডে নারীদের ‘প্রিস্টহুড’-এর অনুমতি মিলেছে মাত্র বত্রিশ বছর আগে, ‘বিশপ’ হওয়ার দরজাও খুলেছে এই সে দিন, ২০১৪ থেকে। এই পশ্চাৎপটে ক্যান্টারবেরির ১০৬তম আর্চবিশপ পদে গত ২৫ মার্চ সারা-র অভিষেক এক ঐতিহাসিক মাইলফলক: মনে রাখতে হবে, রোমান ক্যাথলিক চার্চে আজ পর্যন্ত কোনও নারীর পোপ হওয়া অলীক কল্পনা, প্রিস্টহুডও বারণ।
ধর্মগুরুদের পূর্বজীবন নিয়ে সাধারণ্যে এক কৌতূহল থাকে: কী ছিলেন, কেমন ছিলেন তিনি, কোন পেশা বা বৃত্তিধারী ছিলেন ইত্যাদি। প্রাচ্যের সাধু-সন্ন্যাসীরা তাঁদের অতীত সম্বন্ধে যেমন তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করেন, পাশ্চাত্যে তেমন নয়। সারা যেমন দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এ নার্স হিসেবে, ক্যানসার রোগীদের সেবায়। সেখানেও তাঁর উত্তরণ বিস্ময়কর: ট্রেনি, ওয়র্ড সিস্টার, ডিরেক্টর অব নার্সিং ধাপগুলি পেরিয়ে সবচেয়ে কম বয়সে ইংল্যান্ডের চিফ নার্সিং অফিসার। এই সহস্রাব্দের শুরুর দিকে তাঁর প্রিস্টহুড, তিন বছরের মাথায় সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোদস্তুর চার্চ অব ইংল্যান্ডের ‘কাজ’-এ আত্মনিয়োগ; ২০১৮-য় হন লন্ডনের প্রথম মহিলা বিশপ, এও এক রেকর্ড। সেই অর্থে তাঁর আর্চবিশপ পদপ্রাপ্তি অপ্রত্যাশিত নয়। তবে পূর্বজীবনে নার্স ছিলেন বলেই হয়তো অ্যাংলিকান খ্রিস্টানরা আশায় বুক বাঁধছেন আরও— রোগপীড়িত মানুষের কায়িক সেবার স্তর থেকে এক বৃহত্তর, উচ্চতর ও গভীরতর সেবাপরায়ণতার স্তরে তিনি উন্নীত করবেন চার্চ অব ইংল্যান্ডকে। সারা-র আনুষ্ঠানিক অভিষেকে রাজার প্রতিনিধিস্বরূপ প্রিন্স ও প্রিন্সেস অব ওয়েলস, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলপ্রধান-সহ আমন্ত্রিত প্রায় দু’হাজার অতিথির মধ্যে এনএইচএস-এর নার্স ও স্থানীয় হাসপাতালগুলির সেবাকর্মীদের উপস্থিতিও তারই প্রতীক।
ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ পদে সারা-র অধিষ্ঠান আনন্দের, তবে নিঃশঙ্ক নয়। বিশেষত এমন এক সময়ে তিনি এ পদে আসীন হলেন যখন চার্চ অব ইংল্যান্ড নানাবিধ সমস্যা ও দ্বন্দ্বে নাজেহাল। অ্যাংলিকানরা ছড়িয়ে আছেন বিশ্ব জুড়ে, ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ হওয়ার সূত্রে সারা এখন ‘অ্যাংলিকান কমিউনিয়ন’-এরও প্রধান। কিন্তু পদপ্রাপ্তি হলেই আনুগত্য আসে না: এর মধ্যেই বিশ্বের নানা প্রান্তে কয়েকটি অ্যাংলিকান বিরুদ্ধস্বর জানিয়েছে তারা কোনও নারীকে সর্বোচ্চ ধর্মগুরু হিসেবে মানবে না। বিশ্বে ধর্মতন্ত্রের একটি বড় চালিকাশক্তি এখনও পুরুষতন্ত্র; সারা নিজেও তাঁর বিশপজীবনের অভিজ্ঞতা-রোমন্থনে জানিয়েছেন, ধর্ম বা সমাজ নারীর অধ্যাত্ম-নেতৃত্বও সর্বদা মেনে নিতে চায় না। এহ বাহ্য, সাম্প্রতিক অতীতে অ্যাংলিকান চার্চের অধীনে এক সামার ক্যাম্পে যৌন হেনস্থার ঘটনায় শোরগোল ওঠে, সারা-র পূর্বসূরি আর্চবিশপ এর জেরে পদত্যাগও করেন। সেই ক্ষত আজও জুড়িয়েছে বলা যাবে না: ধর্মতন্ত্রের ক্ষমতার হাতে ন্যায়বিচারের কণ্ঠরোধের যে অভিযোগ, অচিরেই তা নতুন আর্চবিশপের দরবারে পেশ হতে পারে। ঘরে-বাইরে অন্তরায় কম নয়। তা বলে সারা-র কৃতিত্বকে লঘু করা চলে না কোনও মতেই। তিনি এক মূর্তিমতী ‘ঐতিহাসিক প্রথম’, তাঁর মতো বহু প্রথমাই জীবনের নানান ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, সফলও হয়েছেন— আশা সেখানেই।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে