দাসপ্রথাই মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্যতম অপরাধ। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভা মার্চের শেষ সপ্তাহে বহু আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান ও লাতিন আমেরিকার দেশের এই দীর্ঘ দিনের দাবিটিকে স্বীকৃতি দিল। শারীরিক নির্যাতনের নিকৃষ্টতর উদাহরণ হয়তো খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু মানুষের মনুষ্যত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তাকে পণ্যে পর্যবসিত করার মাপকাঠিতে সত্যিই দাসপ্রথার তুল্য অমানবিকতা আর নেই। দাসপ্রথার ইতিহাস প্রোথিত বর্ণবিদ্বেষে, এবং জাতিগত আর্থিক ক্ষমতার তারতম্যে। এবং, তার ব্যাপ্তি বৈশ্বিক মাপকাঠিতে। কোনও অবস্থাতেই এই অন্যায়কে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চ্যুতি বলে দেখানো চলে না— যদিও, গত একশো বছরে সে চেষ্টা বহু বার হয়েছে। এই অন্যায় কাঠামোগত, এক বিপুল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্য জনগোষ্ঠীর ঘৃণাপ্রসূত সামূহিক শোষণ। রাষ্ট্রপুঞ্জের এই স্বীকৃতি অতএব সেই ঐতিহাসিক অপরাধের ক্ষতিপূরণের দাবির পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। উল্লেখ্য যে, রাষ্ট্রপুঞ্জের এই বিবৃতি মানতে, বা সেই অনুযায়ী দেশের আইন পরিবর্তন করতে কোনও দেশ বাধ্য নয়। কিন্তু, দীর্ঘ দিন ধরে যাঁরা দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণের দাবিতে লড়ছেন, তাঁদের সেই লড়াই এর ফলে বলশালী হবে। দাসপ্রথার ‘রেপারেশন’ বা প্রায়শ্চিত্তের দাবিটি কেবল ক্ষমাপ্রার্থনায় সীমিত নয়। একবিংশ শতকে এসে জার্মানি বা নেদারল্যান্ডস-এর মতো একাধিক দেশ দাসপ্রথায় অংশগ্রহণ করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছে; ইংল্যান্ডের মতো দেশ দুঃখপ্রকাশ করেছে; আমেরিকা দেশের আইনসভায় রেজ়লিউশন পাশ করে জানিয়েছিল যে, দাসপ্রথা অতি দুর্ভাগ্যজনক একটি ঘটনা। কিন্তু, ক্ষমাপ্রার্থনার যে স্তরেই থাকুক না কেন, কোনও দেশই আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে সম্মত হয়নি। সে লড়াই এখনও চলছে।
আর্থিক ক্ষতিপূরণের কথা উঠলে প্রথম যে প্রতিযুক্তি পেশ করা হয়, তা হল, প্রায় দুই শতাব্দী আগের এই প্রথায় কোন ব্যক্তি কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তা নির্ধারণ করা যেমন কঠিন, তেমনই তাঁদের উত্তরসূরিদের চিহ্নিত করাও কঠিন। এবং প্রশ্ন ওঠে, অন্যায়টি যত ভয়ঙ্করই হোক না কেন, দু’শো বছর আগের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে বর্তমান প্রজন্মকে টাকা দেওয়ার কি কোনও যৌক্তিকতা আছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা প্রয়োজন একটি বৃহত্তর যুক্তির পরিসরে— উন্নয়নের পথ-নির্ভরতার যুক্তি। কোনও পরিবারের উপরে বঞ্চনা বা অন্যায় কোনও একটি প্রজন্মে এসে থামলেও তার রেশ থেকে যায় আরও অনেক প্রজন্ম অবধি— বস্তুত, সে রেশ কোথাও সম্পূর্ণ ভাবে মিলিয়ে যায় কি না, সে উত্তর অনিশ্চিত। আইন প্রণয়নের ফলে ক্রীতদাসের জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তি মেলার পর সেই কালো মানুষদের কী হয়েছিল, সে কথা ভাবলেই এই উন্নয়নের গতিপথের স্বরূপ বোঝা সম্ভব। তাঁদের শিক্ষা ছিল না, হাতে কোনও সম্পদ ছিল না, শ্বেতাঙ্গ সমাজে তিলমাত্র ঠাঁই ছিল না— ফলে, বহু ক্রীতদাসই তাঁদের পূর্বতন মালিকের কাছেই কাজে লেগে গিয়েছিলেন। একই কাজ, একই অত্যাচার— শুধু ক্রীতদাস হিসাবে নয়, শ্রমিক হিসাবে। তাতে তাঁদের জীবনের বাস্তব সত্যটি খুব পাল্টায়নি। সন্তানকে সুস্থ জীবন দেওয়ার, সামাজিক গতিশীলতা অর্জন করতে সহায়তা করার কোনও উপায় তাঁদের ছিল না। সাদাদের সঙ্গে কালো মানুষের ব্যবধান তাই কমেনি। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, তার ছায়া মোছেনি। এই ছায়াই উন্নয়নের পথে বাধা।
ক্রীতদাসের উত্তরসূরিরা ক্রমাগত সামাজিক সিঁড়িতে পিছিয়ে পড়েছেন। গণস্মৃতি থেকে দাসপ্রথা সম্পূর্ণ মুছে যাওয়ার বহু পরেও সামগ্রিক ভাবে সেই পিছিয়ে পড়া থামেনি। এবং, সামাজিক স্তরে তৈরি হয়েছে ব্যবধান— কৃষ্ণাঙ্গদের ‘অযোগ্যতা’ বহু ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ফলে খোলা বাজারও তাঁদের জন্য দরজা খোলেনি। এই বঞ্চনা থেকে তৈরি হয়েছে অপরাধপ্রবণতা, বা বৃহত্তর সমাজে সেই অপরাধপ্রবণতা সম্বন্ধে ধারণা। তার ফলে আরও সঙ্কুচিত হয়েছে সামাজিক গতিশীলতা অর্জনের সুযোগ। এমন উদাহরণের সংখ্যা বাড়িয়ে চলা যায়, কিন্তু মূল কথাটি অপরিবর্তিত থাকে— দুই শতাব্দী আগে বিলুপ্ত এক ভয়ঙ্কর প্রথা আজও এক বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে চলেছে। এমনকি, সেই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের জীবনের গতিপথও, যাঁদের পূর্বপুরুষ দাসপ্রথার শিকার ছিলেন না। ফলে, ক্ষতিপূরণের দাবিটি শুধু যথার্থ নয়, অপরিহার্য। এবং, এই দাবি শুধু কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরই নয়— ন্যায্যতায় বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষেরই এই দাবির শরিক হওয়া কর্তব্য।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে