নেপালে এ বার পরিবর্তনের হাওয়া। দেশের সাধারণ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)-র বিপুল জয়ের পর গায়ক এবং কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বলেন্দ্র শাহের প্রধানমন্ত্রী হওয়া হিমালয়ের এই দেশে এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। এ বারের ভোটে নেপালি কংগ্রেস, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (একীকৃত মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) এবং নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি (মাওয়িস্ট)-র মতো প্রতিষ্ঠিত পুরনো রাজনৈতিক দলগুলি মাত্র কয়েকটি আসন দখল করতে সক্ষম হয়েছে, তা-ও বেশির ভাগই প্রত্যন্ত, পাহাড়ি এলাকাগুলিতে। বরং আরএসপি শুধু নগরাঞ্চলই নয় মধ্য-পাহাড়ি এবং মাধেসি বা তরাই অঞ্চলেও ব্যাপক ভাবে প্রবেশ করেছে, যেখানে ঐতিহ্যগত ভাবে পুরনো দলগুলির আধিপত্য ছিল। খোদ বলেন্দ্র প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি-কে তাঁরই এলাকা ঝাপা-৫’এ প্রায় ৫০,০০০ ভোটে পরাজিত করেন। তুলনামূলক ভাবে নতুন রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে এই বিশাল জনমতকে কেবল নেপালের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের সম্মিলিত হতাশা হিসেবেই নয়, বরং বহু বছরের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সঙ্কট, পৃষ্ঠপোষকতামূলক কার্যকলাপ এবং অন্তর্নিহিত দুর্নীতি হিসেবেও দেখা উচিত। আসলে, শাহের উত্থান তরুণ ভোটারদের মধ্যে গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটায়, যারা ক্রমবর্ধমান ভাবে পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করেন।
নতুন সরকারের সামনে এখন বিস্তর চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, ২০২৫-এ ‘জেন জ়ি’-র যে রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের জেরে দেশে এই পালাবদল ঘটেছে, তাদের দাবির প্রতি মনোযোগী হতে হবে নতুন সরকারকে। ওই বিক্ষোভ দমনের তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল যার সুপারিশগুলির মধ্যে ছিল দোষীদের বিচার, যার মধ্যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি-র নামও অন্তর্ভুক্ত। এখন এই সুপারিশগুলি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নতুন সরকারের উপরে। দ্বিতীয়ত, আরএসপি-র বিশ্বাসযোগ্যতা তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, বিশেষত শাহের সুনামের উপর নির্ভর করছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল দুর্নীতি। তবে আপাতত নতুন সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি অর্থনীতিজনিত। তরুণদের দেশান্তরের সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি— দেশে কর্মসংস্থানের অভাব। ফলে শাহের কাছে প্রত্যাশাই হল সুস্থায়ী অর্থনীতির পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়িয়ে তোলা।
এ দিকে, আরএসপি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে, নেপালের বিদেশনীতিতেও পরিবর্তন আসতে চলেছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির পতনের ফলে ভারত ও নেপালের মধ্যে কয়েক দশকের রাজনৈতিক যোগাযোগেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এমতাবস্থায়, বহিরাগত হস্তক্ষেপের ধারণা এড়িয়ে নেপালের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির দক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতার সম্পর্ক থেকে অর্থনৈতিক কূটনীতির দিকে ঝোঁকাই বুদ্ধিমানের কাজ— জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন, সংযোগ প্রকল্পে বৃহত্তর সহায়তা এবং নেপালের তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন ও রফতানি প্রসারে সহযোগিতা নেপালের নবীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কে গতি আনতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনীতির খেলায় চিনের সঙ্গে টক্কর দিতে হলে, এই সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না দিল্লির।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে