অবশেষে একশো দিনের কাজের প্রকল্পের চাকা ঘুরছে— রাজ্য সরকার সব জেলাকে নির্দেশ দিয়েছে শ্রম বাজেট তৈরি করতে। যার অর্থ, প্রকল্পে দুর্নীতি রোধ করার লক্ষ্যে যে সব শর্ত আরোপ করেছিল কেন্দ্র, তা মেনে নিতে বাধ্য হল রাজ্য। গ্রামের গরিব মানুষের রোজগারের নিরাপত্তা দেওয়ার লক্ষ্যে চালু এই প্রকল্পটি কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলের ‘রাজনৈতিক খেলা’-র কেন্দ্রে চলে আসায় চার বছর চলছে অচলাবস্থা। কেন্দ্র দুর্নীতি দেখিয়ে টাকা বরাদ্দ বন্ধ করেছে, রাজ্য কেন্দ্রকে দুষেছে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের জন্য। কলকাতা হাই কোর্ট রায় জারির পরবর্তী ঘটনাগুলিকে নজরে রাখলে বলা চলে, খেলার ফল এখন ১-১। আদালতের নির্দেশ মেনে প্রকল্প চালু করতে বাধ্য হল কেন্দ্র। অন্য দিকে, তৃণমূল সরকারও নিজের অবস্থান থেকে সরতে বাধ্য হল। ৯ ডিসেম্বর, কোচবিহারে মুখ্যমন্ত্রী এক জনসভায় বলেছিলেন, কেন্দ্রের আরোপ করা শর্তগুলি অসম্মানজনক, কখনওই মানা হবে না। বরং রাজ্য সরকার তার ‘কর্মশ্রী’ প্রকল্পে সত্তর দিনের জায়গায় একশো দিন কাজ দেবে। এই ঘোষণার সপ্তাহ পাঁচেকের মাথায় পিছু হটে কেন্দ্রের শর্ত মেনে নিয়ে শ্রম বাজেট তৈরির তোড়জোড় শুরু হল— সম্ভবত নির্বাচনী রাজনীতির চাপে। কেন্দ্রীয় সরকার ১২৫ দিন কাজ দিতে রাজি, তৃণমূল সরকারই রাজ্যবাসীকে কাজ থেকে বঞ্চিত করছে— বিজেপির এই প্রচারকে সামাল দেওয়া তৃণমূলের পক্ষে সহজ হত না। এই প্রথম নয়, তৃণমূল সরকার একাধিক বার কেন্দ্রের প্রকল্প প্রত্যাখ্যান করে বিকল্প প্রকল্প চালু করে জনসমর্থন পেতে চেয়েছে। পিএম-কিসান, প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকাশ্যে কলহের পর পিছু হটেছে রাজ্য। কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু করতে হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য কেন্দ্রের শর্তগুলিও। কুড়ি লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া, এককালীন প্রকল্পের সংখ্যা দশে বেঁধে দেওয়া, কেবলমাত্র স্থায়ী সম্পদ তৈরির কাজে সীমিত থাকা— এই ধরনের অনমনীয় শর্ত আরোপ করা হচ্ছে পঞ্চায়েতগুলির উপরে। স্থানীয় উন্নয়নের প্রয়োজন, বা কাজের চাহিদা মেটানোর সঙ্গে এ সব শর্ত কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে? দুর্যোগের পর পুকুর থেকে নোনা জল মুক্ত করা, পূর্বসৃষ্ট সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, এগুলি কেন বাদ পড়বে? তদুপরি, সব প্রকল্প জেলাশাসককে দিয়ে অনুমোদন করানোর শর্তটি দীর্ঘসূত্রতা বাড়াতে বাধ্য। যে কোনও দুর্নীতির জন্য জেলাশাসকের দফতরকে সরাসরি দোষার্হ করলে স্বভাবতই অনুমোদন পাওয়া আরও কঠিন হবে। পঞ্চায়েতব্যবস্থার সংবিধান-প্রদত্ত স্বাতন্ত্র্যকেও খর্ব করছে এই শর্তটি।
অসার, অবাস্তব শর্ত চাপিয়ে কেন্দ্র এই প্রকল্পকে হীনবল করে জনস্বার্থের বিপুল হানি ঘটাচ্ছে। বাস্তবিক, কেন্দ্রে এবং রাজ্যে, দু’টি শাসক দলই জনকল্যাণ এবং সামাজিক সুরক্ষার নীতিকে যে ভাবে জনসমর্থন জেতার খেলায় বাজি রাখছে, তাতে নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নাগরিক। মনরেগা প্রকল্প স্থগিত থাকায় গ্রামীণ বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে, স্কুলছুট বেড়েছে, কমেছে মজুরি। বিশেষত শ্রমজীবী মেয়েদের অনেক ক্ষেত্রে কোভিড-পূর্ববর্তী বছরগুলির চেয়ে কমেছে। অন্য দিকে ‘কর্মশ্রী’ প্রকল্পটিকে মনরেগার বিকল্প বলে বার বার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যা বিভ্রান্তিকর। বিভিন্ন সরকারি দফতরের নির্মাণ-প্রকল্পের মজুরি খাতে বরাদ্দকে একটি পৃথক প্রকল্প বলে ঘোষণা করা কত দূর সঙ্গত? সামাজিক অডিট না থাকায় প্রকৃতপক্ষে কত শ্রমিক কত মজুরি পেলেন, তা অস্বচ্ছ। সর্বোপরি, সরকারি তথ্য অনুসারে দু’বছরে কর্মশ্রীতে খরচ হয়েছে ৩৬৮৫ কোটি টাকা। যেখানে ২০১৮-১৯ সালে মনরেগায় কেবল অদক্ষ শ্রমিকের মজুরি বাবদ খরচ হয়েছিল ৫৭৩৮ কোটি টাকা। রাজ্যের রাজকোষ গ্রামীণ কর্মনিশ্চয়তার জন্য যথেষ্ট নয়। বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলির এই ক্ষুদ্রতা আর কত সইতে হবে দেশবাসীকে?
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে