Republic Day

ভারতীয়

যে দিনটিতে ভারত আনুষ্ঠানিক ভাবে এই প্রজা থেকে নাগরিকে উত্তরণ সংক্রান্ত পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করল, ইতিহাসের এক অলীক রসিকতায় অন্তত বাংলা ভাষায় সেই দিনটি খ্যাত হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসাবে। তবে নামে কী বা যায় আসে!

শেষ আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩২
Share:

উত্তর-ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশকে অংশত ন্যায্য কারণেই একটি প্রশ্ন বারে বারে তুলেছেন— ঔপনিবেশিক শাসন থেকে জাতীয় সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরে কি সত্যিই ভারত নামক রাষ্ট্রটির চরিত্র পাল্টেছিল? এই প্রশ্নের মাত্রা একাধিক— তার মধ্যে অন্যতম, স্বাধীন ভারতের সংবিধানের সঙ্গে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের বিপুল সাযুজ্য। প্রশ্নটি সারগর্ভ। কিন্তু, এই প্রশ্নটি একই সঙ্গে এড়িয়ে যায় ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনে মৌলিক অধিকারের উল্লেখ না থাকা স্বাভাবিক— সেটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসকের আইনি ব্যবস্থা, যেখানে ভারতীয়রা ছিলেন নিছক প্রজা। স্বতন্ত্র ভারত দেশের মানুষকে স্বীকার করল নাগরিক হিসাবে— রাজার অনুগ্রহাকাঙ্ক্ষী প্রজা নয়, রাজ্য শাসনের কাজে সমান অংশীদার নাগরিক। ভারতীয় সংবিধানের প্রাণকেন্দ্রে রচিত হল রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের এই নতুন সনদ। যে দিনটিতে ভারত আনুষ্ঠানিক ভাবে এই প্রজা থেকে নাগরিকে উত্তরণ সংক্রান্ত পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করল, ইতিহাসের এক অলীক রসিকতায় অন্তত বাংলা ভাষায় সেই দিনটি খ্যাত হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসাবে। তবে নামে কী বা যায় আসে! ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে তার নাগরিকেরা বাঁধা পড়লেন মৌলিক অধিকার ও দায়িত্বের সুতোয়।

ভারতের সংবিধান রচিত হলে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলি যে তার অন্তর্ভুক্ত হবেই, এ কথাটি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কেন্দ্রে ঠাঁই পেয়েছিল ১৯৫০-এর দু’দশকেরও বেশি আগে। ১৯২৮ সালে কলকাতায় ‘অল পার্টি কনফারেন্স’-এর চূড়ান্ত অধিবেশনে ভারতের প্রস্তাবিত সংবিধান পেশ করা হয় মোতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে— যা ‘নেহরু রিপোর্ট’ নামে খ্যাত। ভারতীয় নাগরিক কে, এই প্রশ্নের যে উত্তর সেই রিপোর্ট দিয়েছিল, স্বাধীন ভারত তাকেই মান্যতা দিয়েছে— বিদেশি কোনও রাষ্ট্রের নাগরিক নন, ভারতে বসবাসকারী এমন সবাই ভারতীয় নাগরিক হিসাবে গণ্য হবেন। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা লিঙ্গের কোনও প্রভেদ সেই নাগরিক-কল্পনায় ছিল না। এই সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে একটি পরিসীমা অনস্বীকার্য ছিল— একে এমন একটি নথি হতেই হত, যা কনফারেন্সের অন্তর্ভুক্ত সব রকম গোষ্ঠীস্বার্থের প্রতিনিধি দলগুলির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এবং, এই ঐতিহাসিক বাধ্যতা জন্ম দিয়েছিল এক আশ্চর্য ধর্মনিরপেক্ষ সহিষ্ণু নীতিগুচ্ছের। আইনের চোখে কোনও বৈষম্য থাকবে না, প্রত্যেকের নিজস্ব ধর্ম পালনের সম্পূর্ণ অধিকার থাকবে, প্রত্যেকের মত প্রকাশের সমান স্বাধীনতা থাকবে, প্রাথমিক শিক্ষা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার হিসাবে গণ্য হবে— নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসাবে এমন কথাগুলির পাশাপাশি ছিল আর একটি কথা: ভারত নামক রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকবে না, এবং রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এমন কোনও আচরণ করবে না যা কোনও একটি ধর্মের পক্ষপাতী বা কোনও ধর্মের প্রতি বৈষম্যমূলক। ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি যখন ক্রমে তীব্র হয়ে উঠছে, তখন ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি কল্পনা করেছিল এমন একটি রাষ্ট্রের, ভারতীয় ব্যতীত অন্য কোনও পরিচিতি যে রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্ত নয়।

নেহরু রিপোর্টের তিন বছরের মাথায়, ১৯৩১ সালে, প্রকাশিত হল করাচি রেজ়লিউশন— তারও মুখ্য চরিত্র নেহরু, তবে পিতা মোতিলাল নন, পুত্র জওহরলাল। এই নথিতেও গৃহীত হল নাগরিকের মৌলিক অধিকারের তালিকা; নেহরু রিপোর্টের প্রতিধ্বনি থাকল এতেও, কিন্তু পরিসর আরও বাড়ল। নাগরিকত্বের সংজ্ঞাকে আরও এক ধাপ অগ্রসর করে জানানা হল, স্বাধীন ভারতে সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার থাকবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র যে সবাইকে সমান চোখে দেখবে শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রের পরিচালনায় অংশগ্রহণ করা নাগরিকের অপরিহার্য অধিকার হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হল আর একটি কথা— যে কোনও নাগরিকের অধিকার থাকবে দেশের যে কোনও প্রান্তে বসবাস করার, এবং সর্বত্রই তিনি আইনের চোখে সমান। অর্থাৎ, ভারত নামক রাষ্ট্রটি যে তার নাগরিককে কোনও ক্ষুদ্র খোপে আবদ্ধ করতে চায় না, সে কথাটি স্পষ্টতর হল। এই দুই জাতীয়তাবাদী উত্তরাধিকার পরবর্তী কালে প্রবাহিত হয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধানে। তার কাঠামোয় ঔপনিবেশিক আইনের ছাপ থেকেছে সে কথা যেমন সত্য; তেমনই এটাও সত্য যে, সেই সংবিধানের আত্মাটি ভারতীয়। উদারতম জাতীয়তাবাদী কল্পনা যে ভারতীয়ত্বকে নির্মাণ করেছে, সংবিধান তাকে ধারণ করেছে আত্মায়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন