DA Controversy

অধিকার ও ন্যায়

শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, মহার্ঘ ভাতা সরকারি কর্মীদের বলবৎযোগ্য আইনি অধিকার।

শেষ আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৬
Share:

মহার্ঘ ভাতা নিয়ে রাজ্য সরকারের চোর-পুলিশ খেলা এ বার শেষ হোক। দফায় দফায় আদালতের দ্বারস্থ হওয়া, এবং প্রতি বারই বিফলমনোরথ হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে রাজ্য সরকার যদি শিক্ষা নেয়, যদি স্বীকার করে যে, এই দায় থেকে পালানোর সত্যই কোনও উপায় নেই, তা হলে এই কুনাট্যে যবনিকা পড়তে পারে। এ দফায় শীর্ষ আদালতে রাজ্যের বক্তব্য ছিল, ২০০৮ থেকে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা মিটিয়ে দিতে হলে রাজকোষের উপরে বিপুল চাপ পড়বে। কথাটি সত্য। হিসাব বলছে, মহার্ঘ ভাতা বাবদ বকেয়া অন্তত ৪০,০০০ কোটি টাকা। তার একাংশ মিটিয়ে দিতে হলেও রাজকোষের উপরে বিপুল চাপ পড়বে। কিন্তু, শীর্ষ আদালত জানিয়েছে যে, এই যুক্তিতে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা প্রদান বন্ধ রাখা যায় না। কর্মীদের বেতন এবং ভাতা নির্ধারণের অলঙ্ঘনীয় অধিকার রাজ্য সরকারের আছে— কিন্তু, এক বার কোনও সিদ্ধান্তে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে তা থেকে পিছিয়ে আসা যায় না। শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতির বেঞ্চ অবশ্য রাজ্যের রাজকোষের কথাও মাথায় রেখেছে। যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কর্মীদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি যেন রাজকোষের কথাও মাথায় রাখা হয়। এই মুহূর্তে রাজ্য সরকারের কর্তব্য, ফের আইনের ফাঁক খুঁজতে মরিয়া না-হয়ে কমিটির সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে বকেয়া প্রদানের একটি গ্রহণযোগ্য পথ নির্ধারণ করা। এমন ভাবে, যাতে রাজ্যের উন্নয়ন কর্মসূচি ব্যাহত না হয়।

শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, মহার্ঘ ভাতা সরকারি কর্মীদের বলবৎযোগ্য আইনি অধিকার। চাকরির শর্ত হিসাবে মহার্ঘ ভাতা যে-হেতু উল্লিখিত, ফলে তা কর্মীদের অধিকার হিসাবে পরিগণিত। কিন্তু, আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও বণ্টনের ন্যায্যতা সংক্রান্ত একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা প্রয়োজন। মহার্ঘ ভাতা প্রদানের কারণ, ক্রমবর্ধমান বাজারদরের সঙ্গে কর্মীর আয়ের যাতে সঙ্গতি থাকে, তা নিশ্চিত করা। দেশের দেড়শো কোটি মানুষের এক অতি সামান্য অংশ সরকারি কর্মী হওয়ার সুবাদে এই ভাতার অধিকারী। তবে, বাজারের খরচ সকলের জন্যই সমান হারে বাড়ে। যাঁর আয় যত কম, তাঁর পক্ষে সেই বর্ধিত ব্যয়ের বোঝা বহন করা ততই কঠিন। যে দেশে প্রতি দশ জন কর্মীর মধ্যে ন’জনই অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন, সেখানে বেতনের নিরিখে সরকারি কর্মীরা যে একেবারে সর্বোচ্চ শ্রেণির বাসিন্দা, তা নিয়ে সংশয় নেই। যেখানে দরিদ্রতর মানুষের কাছে ক্রমবর্ধমান বাজারদরের সঙ্গে যুঝবার কোনও আয়ুধ নেই, সেখানে সর্বোচ্চ বেতনভুক শ্রেণির সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতার অধিকারটি ন্যায্যতার কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হয় কি? স্মতর্ব্য যে, এখানে সরকারের তরফে চুক্তিভঙ্গকে সমর্থন করার কোনও প্রশ্নই নেই— সংশয় এই ‘চুক্তি’র অন্তর্নিহিত ন্যায্যতা বিষয়ে।

বঙ্গীয় রাজনীতিতে যাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধী, তাঁরা স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত। তাঁদের একটি বড় অংশ আবার লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্পের বিরোধী— তাকে ‘ভিক্ষা’ হিসাবে চিহ্নিত করতে অভ্যস্ত। রাজকোষের উপরে লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্প কী প্রভাব ফেলছে, অথবা কার্যত সর্বজনীন আর্থিক হস্তান্তর প্রকল্পের কোনও অর্থনৈতিক যুক্তি আছে কি না, সে প্রশ্ন ভিন্ন— এবং, বহু মাত্রাতেই তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অবস্থান সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু, এই প্রকল্পকে ‘ভিক্ষা’ বললে তাকে ‘ফিসক্যাল’ যুক্তিতে বিরোধিতা বলা চলে না। মহার্ঘ ভাতার সমর্থক, কিন্তু লক্ষ্মীর ভান্ডারের বিরোধী, এই রাজনৈতিক অবস্থানটির অর্থ হল এই— সমাজের সর্বোচ্চ বেতনভুক শ্রেণির জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার সমর্থন, কিন্তু দরিদ্রতম অংশের জন্য তুলনায় অনেক কম পরিমাণ সহায়তারও বিরোধী। রাজনীতি বড় বালাই, সন্দেহ নেই— কিন্তু, তার মধ্যে ন্যায্যতার ছিটেফোঁটা অবশিষ্ট থাকলে এই অবস্থানটির দিকে এক বার ফিরে তাকানো ভাল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন