Donald Trump

খামখেয়াল তন্ত্র

আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ‘ম্যাডম্যান থিয়োরি’-র পথই কি নিয়েছেন ট্রাম্প? কিন্তু প্রতিপক্ষের উপর সুবিধা অর্জনের জন্য অনিয়মিত বা অপ্রচলিত আচরণের কৌশলগত ব্যবহার আর বেপরোয়া আচরণের দ্বারা বিশ্বাসে আঘাত করার মধ্যে পার্থক্য আছে।

শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৮
Share:

নতুন বছরের প্রথমেই চমকের পর চমক। প্রথমে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সস্ত্রীক ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তাঁর বাসভবন থেকে তুলে এনে ভূ-রাজনীতিতে হইচই ফেলে দিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার পরই স্বশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবি পুনরায় উত্থাপন করে আকস্মিক ভাবেই ইউরোপীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং নেটো জোটকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিলেন তিনি। ট্রাম্পের ঘোষণায় ইউরোপীয় নেতারা হতচকিত বললে ভুল হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর, আরও স্পষ্ট করে বললে, রাষ্ট্রপুঞ্জ গঠনের পর, বিশ্বকূটনীতিতে এত বড় সঙ্কটমুহূর্ত আর আসেনি বললেই চলে। ট্রাম্প যে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের ডাক দিয়েছেন, তা সরাসরি রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিযোগী হিসাবে বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সঙ্কল্প। স্বাভাবিক ভাবেই ইউরোপের প্রধান দেশগুলি, চিন— এবং ভারত— এই মুহূর্তে বিরাট কূটনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি। প্রসঙ্গত, উন্নত ইউরোপীয় দেশের বহু নেতা ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের উপর জোর দিয়ে আমেরিকার বলপ্রয়োগের প্রয়াসটিকে বাধা দিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সেখানে সেনা মোতায়েন রেখেছেন। কিন্তু পরবর্তী পদক্ষেপ?

দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এ ট্রাম্পের বার্তাটি এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তাঁর বক্তব্য, গ্রিনল্যান্ডকে কব্জা করতে তিনি হয়তো বলের আশ্রয় নেবেন না, কিন্তু তেমন পরিস্থিতি এলে আমেরিকাকে রোখা যাবে না। শোনা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কিছু দেশের উপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। ১ জুন থেকে তা ২৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যদি গ্রিনল্যান্ড কেনা বা অধিগ্রহণ বিষয়ে কোনও চুক্তিতে তখনও না পৌঁছনো যায়। এই শুল্ক-‘শাস্তি’র তালিকায় ডেনমার্ক ছাড়াও রয়েছে ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন এবং ব্রিটেন। লক্ষণীয়, শুল্ক আরোপ কোনও স্বাভাবিক বাণিজ্য নীতি নয়— অন্যান্য সরকার কর্তৃক বাণিজ্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমাধান হিসেবে তা আরোপ হয়ে থাকে। অথচ, এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ছাড় আদায়ের জন্য এই ‘শুল্ক’কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন ট্রাম্প। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডরিকসনের দাবি, ইউরোপকে এ ভাবে ‘ব্ল্যাকমেল’ করা যাবে না। ট্রাম্পের হুমকি শুনে ইইউ নেতারা আমেরিকার পণ্য আমদানির উপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরোর শুল্ক প্যাকেজের কথা ভাবছিলেন। শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক শক্তি আস্ফালন এবং হুমকি মোকাবিলায় ইইউ-এর পরিকল্পনাকে বর্ণনা করতে যে পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়, সেই ‘ট্রেড বাজ়ুকা’ চালু করার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছিল। ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাকরঁ ইতিমধ্যেই ‘অ্যান্টি-কোয়ার্শন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (এসিআই)-এর আহ্বান জানিয়েছেন, যা ইউরোপীয় বাজারে আমেরিকার প্রবেশাধিকার সীমিত করবে। মূলত চিনকে মাথায় রেখেই এটি তৈরি হলেও, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একে আমেরিকার বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করা হতে পারে। তবে, আশার কথা, দাভোসে নেটো-র সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুট-এর সঙ্গে আলোচনার পরে এ সব সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত।

আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ‘ম্যাডম্যান থিয়োরি’-র পথই কি নিয়েছেন ট্রাম্প? কিন্তু প্রতিপক্ষের উপর সুবিধা অর্জনের জন্য অনিয়মিত বা অপ্রচলিত আচরণের কৌশলগত ব্যবহার আর বেপরোয়া আচরণের দ্বারা বিশ্বাসে আঘাত করার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাঁর সময়ে একাধিক অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক চাপ এই কৌশলের মাধ্যমে সামলানোর চেষ্টা করেছিলেন নিক্সন। কিন্তু যে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ইতিমধ্যেই বিদ্যমান, সেখানে এই কৌশলের প্রয়োগ পরিস্থিতি জটিলতর করে। ট্রাম্পের কাজকর্মে প্রমাণিত, প্রভাব ফলানোর একমাত্র পথ হুমকি এবং বলপ্রয়োগ বলেই তাঁর বিশ্বাস। গ্রিনল্যান্ড সঙ্কট তাই কোথায় পৌঁছয়, দেখার জন্য এখন গোটা বিশ্বই উৎকণ্ঠিত।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন