দীর্ঘ পাঁচ দশকের অবনতি ও স্থবিরতা অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গ এ বার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে হাঁটবে, বাজেটে এমন আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সন্দেহ নেই, পূর্বসূরিরা তাঁর কাজটি একই সঙ্গে কঠিন এবং সহজ করে দিয়েছেন। কঠিন, কারণ এক দিকে রাজ্য ডুবে রয়েছে বিপুল পরিমাণ ঋণে; অন্য দিকে, বিবিধ রাজনৈতিক কারণকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে এ রাজ্যে শিল্প পরিকাঠামো বলতে কার্যত কিছু তৈরি হয়নি— ফলে, দ্রুত উন্নয়ন করার পথে কাঠামোগত বাধা রয়েছে। আবার, এক অন্য অর্থে অর্থমন্ত্রীর কাজটি সহজ, কারণ তাঁর পূর্বসূরিরা পশ্চিমবঙ্গকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছেন, তাতে এখন যতটুকু কাজ করা সম্ভব হবে, তাকেই চোখধাঁধানো উন্নতি বলে মনে হতে পারে। প্রথমেই লক্ষণীয়, এই বাজেটে তিনি অনেকগুলি প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছেন। সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ দিনের মহার্ঘ ভাতা সংক্রান্ত দাবি অন্তত আংশিক ভাবে পূরণ হয়েছে। আইসিডিএস কর্মীদের বেতন বেড়েছে; সিভিক ভলান্টিয়ারদেরও বেতন বেড়েছে। সরকারি হাসপাতালে রোগীপিছু খাবারের ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটিও স্বাগত। পাশাপাশি, বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে নগদ হস্তান্তরের ঘোষণা হয়েছে। তবে, এই ক্ষেত্রগুলিতে অন্তর্ভুক্তির শর্তের কারণে যোগ্য প্রাপকদের একাংশের নাম বাদ পড়ে যেতে পারে, এমন একটি সংশয়ও রয়েছে। এক লক্ষ নতুন সরকারি চাকরির কথা ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। সূচনা হিসাবে ভাল— তবে, যত পদ খালি পড়ে রয়েছে, তাতে শুধু এখানেই থেমে গেলে চলবে না।
‘সম্ভাবনা’ শীর্ষক সম্পাদকীয় নিবন্ধে (২২-৬) আশা প্রকাশ করা হয়েছিল, এই সন্ধিক্ষণে পশ্চিমবঙ্গকে যথাযথ দিশায় চালিত করতে অর্থমন্ত্রী সফল হবেন। এই বাজেটে সে আশা পূরণের লক্ষণ রয়েছে— তাঁরা পশ্চিমবঙ্গকে সরকারি সহায়তা-নির্ভর কল্যাণরাষ্ট্র থেকে উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিণত করতে চান। শিল্পের জন্য প্রয়োজন মূলত তিনটি। এক, শিল্পের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে আগ্রহী সরকার; শিল্প-সহায়ক পরিকাঠামো; এবং তিন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে কোনও রাজনৈতিক বাধাকে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা। অন্তত পাঁচ দশক পরে পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি সরকার পেয়েছে, যারা বৃহৎ লগ্নির গুরুত্ব বোঝে— এবং, বহু বছর পরে বিরোধীরা এমন অবস্থায় রয়েছেন, যেখানে তাঁদের পক্ষে শিল্পায়নের পথে বাধা তৈরি করা কার্যত অসম্ভব। বাজেটের পরে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ভঙ্গিতে সিন্ডিকেট রাজ নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। এবং জানিয়েছেন, বিনিয়োগের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি হলেই আর স্থানীয় স্তরে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। অর্থাৎ, শিল্পায়নের অনুকূল পরিবেশের জন্য তৃতীয় শর্তটিও পূরণ হবে বলেই আশা।
সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত দ্বিতীয়টি। এই বাজেটে বহু নিদর্শন রয়েছে, যাতে বিশ্বাস করা যায় যে, এই সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়ন-বান্ধব বাহ্যিক পরিকাঠামো নির্মাণের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেবে, যেমন বিভিন্ন করিডর তৈরি, লজিস্টিক পার্ক, রাসায়নিক পার্ক, শিল্প ক্লাস্টার ইত্যাদি তৈরি। ‘সাগরমালা ২’ প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্তিও পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একটি বিষয় অবশ্য উদ্বেগ তৈরি করে। তা হল— কেন্দ্রকে বাদ দিয়ে যেমন কোনও রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব নয়, এও ঠিক যে কেন্দ্রের উপর অধিক নির্ভরতাও রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের পক্ষে মঙ্গলজনক নয়। কেন্দ্রীয় অনুদান বা করের ভাগ থেকে রাজ্যের রাজস্ব আয়ের যত শতাংশ আসা স্বাস্থ্যকর, পশ্চিমবঙ্গে এখন তার থেকে অনেকটাই বেশি। এই মুহূর্তে অবশ্যই ‘ডাবল ইঞ্জিন’-এর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আশায় এ রাজ্য বুক বাঁধছে। তবে ক্রমে রাজ্যের ঋণের বোঝা কমানোর বিকল্প পথসন্ধান জরুরি। রাজ্যের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারই হোক সরকারের মৌলিক লক্ষ্য।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে