বন্দি বলেই ফন্দি জানি

জেল মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, সে দেয় জীবনের স্টেজে ফের ঢোকার নতুন চান্স। সমাজ-সংসারের বাইরে না থাকলে, সমাজ-সংসারকে ঠিকঠাক জরিপ করে নেওয়া যায় না। আরে, একে-৫৬ ছিল না একে-৪৬ ছিল, চিলেকোঠায় লুকিয়ে রেখেছিলাম না আস্তাবলে, পুলিশ দেখে ‘এ কে!’ বলে চেঁচিয়েছিলাম না ‘ও হরি!’, বেয়াড়া বন্ধুর কথায় ভেবলে বন্দুক-কাণ্ড করেছিলাম না বোকা-বোকা অ্যাডভেঞ্চার খেলছিলাম, সে সব চুলোয় যাক। আসল কথা, ভগবান যা করেন, তা মঙ্গলের জন্য। বুধ, বেস্পতির জন্যও।

Advertisement

প্রবন্ধ ২

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:০২
Share:

আরে, একে-৫৬ ছিল না একে-৪৬ ছিল, চিলেকোঠায় লুকিয়ে রেখেছিলাম না আস্তাবলে, পুলিশ দেখে ‘এ কে!’ বলে চেঁচিয়েছিলাম না ‘ও হরি!’, বেয়াড়া বন্ধুর কথায় ভেবলে বন্দুক-কাণ্ড করেছিলাম না বোকা-বোকা অ্যাডভেঞ্চার খেলছিলাম, সে সব চুলোয় যাক। আসল কথা, ভগবান যা করেন, তা মঙ্গলের জন্য। বুধ, বেস্পতির জন্যও। মানে, পট করে হয়তো মনে হবে অমুক ব্যাপারটা পেল্লায় দুর্ভাগ্য, অনেক পরে বোঝা গেল, ওটা করেছে বলেই ইয়া দুর্গতি থেকে রক্ষে পেয়েছিস। কিংবা, ওই দুঃখ জীবনে এমন কিছু যোগ করে গেছে, যা দিব্য অস্ত্রবিশেষ। মানে, তোর মাথায় কাগে বিষ্ঠা ত্যাগ করেছে বলে ভাগ্যকে শাপান্ত করতে করতে গাছতলা ছেড়ে হাঁটা দিলি, তক্ষুনি গাছে কড়কড়াৎ বাজ পড়ল। কিংবা, ডান হাতে বিকট ফোঁড়া হয়ে তোকে ভোগাল তিন হপ্তা, কিন্তু দিয়ে গেল বাঁ হাতে চেক সই করতে পারার কেরদানি। এই যে আমার জেল হল, এই যে জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর ব্যান্ডপার্টি বাজল, এই যে আমি ফের সই করব সিনেমায়, হয়তো মুন্নাভাই-থ্রি দেখার জন্যে কোটি লোক হামলে পড়বে, কে বলতে পারে এতেই আমার ইমেজ তরতরিয়ে টিআরপি পেল কি না। কে বলতে পারে, এ বার আমি যে কয়েদির রোল পাব, তা ফিল্মফেয়ার সুইপ করবে কি না। গোলা দর্শকও মাথা নাড়বে, ওঃ, কী প্যাথস, আসলে ওগুলো তো অ্যাক্টিং নয়, ডাইরেক্ট জীবন থেকে টোকা! এতে আমার বায়োগ্রাফিও ছমছমে হল, ট্র্যাজেডি ও বখামির ককটেল উছলে উঠল, উফ, এখন শুধু অশেষ মজা, অসীম সম্ভাবনা, অকুলান টাকা, ইন্টারভিউতে অনন্ত কৌতূহল: এত দিন কেমন ছিলেন?

Advertisement

জেলখানায় রেডিয়ো জকি-র কাজ করতাম, রীতিমত স্ক্রিপ্ট-টিপ্ট লিখে কথা বলতাম, গান বাজাতাম। কেউ ভাবতেই পারে, এ ভাবে আমি ‘লগে রহো মুন্নাভাই’-এ আমার প্রেমিকার চরিত্রটায় ঢুকে পড়ার চেষ্টা করতাম। আসল কথা, এটা তো একটা পারফর্ম্যান্সের জায়গা রে বাবা, অভিনয়ের কাছাকাছি, তাই করতে ভাল লাগত। ওই আর-জে’গিরির সময় ফের হয়ে যেতাম স্টার, যার কথা শোনার জন্য বেশ কিছু কান আর মন উৎসুক হয়ে আছে। কিন্তু জেলখানা আমায় বাঁচিয়ে রেখেছিল ওই শিল্পের নেট প্র্যাকটিস দিয়ে নয়। বাঁচিয়ে রেখেছিল, ওটা জেলখানা বলেই।

জেল শুনলেই সাবধান হন তো? কিন্তু ওর আসল মানে: বিশ্রাম! জেলে গেলে লোকের দৈনন্দিন সব খিচখিচে বিরক্তির ব্যাপারগুলো সরে যায়। তাকে বাজার যেতে হয় না, ছেলের ইস্কুলের পড়া দেখাতে হয় না, মেজদিদার শ্রাদ্ধ অ্যাটেন্ড করতে হয় না। প্রোমোশন হবে না চাকরি যাবে, সে টেনশন নেই, রোজগার কম কেন: অহরহ খোঁটা নেই। তার এক ধরনের আড়মোড়াময় সন্ন্যাস শুরু হয়, এও বোঝা যায়: মানুষের জীবনে অতি অল্পেই কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়, অত ঘাবড়াবার কিছু নেই। সেনেকা বলেছিলেন, নিয়মিত ক’দিন করে খুব কষ্টে থাকবে, স্বেচ্ছায়। তাতে বুঝতে পারবে, চরম কষ্টও এসে তোমাকে পেড়ে ফেলতে পারবে না। জেলখানা গা-জোয়ারি সেনেকা-সিলেবাস শুরু করে!

Advertisement

হ্যাঁ, বোর লাগে, বন্ধু নেই, হইচই নেই, কিন্তু কিচ্ছু না-থাকার আরামটা এসে ক’দিনের মধ্যেই মলম বুলিয়ে দেয়। অনন্ত শান্তি, প্রকাণ্ড স্বস্তি, গুচ্ছ অবসর। তোমার হাতে কিস্যু নেই, তাই তোমার কোনও দায়ও নেই। সিনেমা করাও নেই, সিনেমা ফ্লপ হল কি না তার ঝঞ্ঝাটও নেই। হাই তোলো, পড়ে থাকা পাখির পালক দেখো, আর নির্বেদ পোয়াতে পোয়াতে ছকে নাও, বেরিয়ে কী ভাবে জীবনটাকে চালাবে। আমি যে তিরিশ কিলো স্লিম হয়েছি, তার কারণ, অবান্তর ব্যাগেজ ঝরে গেছে। ছোটদের কার্টুনের জনপ্রিয় চরিত্র ‘ডোরা’ একটা কথা খুব বলে, ‘লেট আস স্টপ অ্যান্ড থিংক।’ আমাদের ওই স্টপটা একেবারে হারিয়ে গেছে বলে আমরা থিংকটাও আগামী কাল করব বলে ছেড়ে রাখি। জেল মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, সে দেয় সেকেন্ড টেক, জীবনের স্টেজে ফের ঢোকার নতুন চান্স। তার আগে বলে, থেমে থাক, তৈরি হ। প্রতি সন্ধেয় নিজের জীবনটাকে ময়দার লেচির মতো বার বার গোল্লা পাকানো আর ছেতরে দেওয়াটা নেশা দাঁড়িয়ে যায়। রুটিন করে ভেবে ফেলা যায়, কী ভুল করেছি আর কী কক্ষনও করব না। ব্যায়াম ক’টায় শুরু করব আর বউকে ডিভোর্স দেব কি না। সমাজ-সংসারের বাইরে না থাকলে, সমাজ-সংসারকে ঠিকঠাক জরিপ করে নেওয়া যায় না। সেই অমোঘ সুযোগ দেয় জেল।

নিন্দুকে বলবে, তুমি তো প্যারোলেই একশো দিনের বেশি কাটিয়ে দিলে বাপ! অমোঘ সুযোগ ছেড়ে ঘন ঘন বাড়ি আসা কেন? আহা, ওটাও জেলে বসেই ভেবে পাওয়া স্ট্র্যাটেজি। মেগাস্টারের গায়ে একটু পাপের গন্ধ না থাকলে গ্ল্যামার বাড়ে না। না চাইলেও তাকে কিছু অন্যায় সুবিধে ভোগ করতে হয়, যাতে জনতার হিংসের সুইচটা পটপট অন হয়ে যায়। কিন্তু পরিণত প্ল্যানিং-এর কী মহিমা! একদম গোড়া থেকেই স্টার্ট করেছি অ্যাকশন! জেল থেকে বেরনোটাকে ফিলিমের সিন করে দিলাম! মাটিকে চুমু খাওয়া, জেলের ওপর উড়তে থাকা জাতীয় পতাকাকে স্যালুট। মানে, সুপ্পার-দেশপ্রেমী। ওটা শুট করেও রেখেছে রাজকুমার হিরানি, আমার বায়োপিকে ওটাই হবে প্রথম দৃশ্য। যে, দেখো, শিশু ভোলানাথ একটা সামান্য কাণ্ড করে ফেলেছিল, তার জন্যে কী সাফারিংটাই সইতে হল! পাবলিকের চোখ থেকে সিমপ্যাথি, পকেট থেকে টাকা হুড়হুড়িয়ে বেরবে! এখন তো আবার রাষ্ট্রের কাছে ঝাড় খাওয়া লোকের শহিদপনাটা আঁতেলরা খুব নিচ্ছে! আমার ইমেজটা তার ডবল: দেশের কাছে চাবুকও খেলাম মিছিমিছি, আবার সেই দেশকেই চুমু বিলোচ্ছি সাচ্চা! এই জাগলিং কি স্থিতধী প্র্যাকটিস ছাড়া হয়! আবার লোকে ভাবে, জেলে বসে আমি শুধু ঠোঙা বানাচ্ছিলুম!

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement