মানবিক উদ্ধার

কুরুক্ষেত্রের পরিত্যক্ত কূপে প্রায় পঞ্চাশ ঘণ্টা আটকাইয়া থাকিবার পর সেই পাঁচ বছরের শিশুটিকে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় বাহিরে লইয়া আসে সেনাবাহিনী। সারা ভারত সেই লড়াইয়ের দিনগুলিতে মানসিক ভাবে হরিয়ানা সরকার এবং সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়াইয়াছিল। শুধুমাত্র হরিয়ানার ঘরের সমস্যা ভাবিয়া এড়াইয়া যায় নাই। 

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৮ ০০:০৯
Share:

উদ্ধারকাজে ব্যস্ত এক ডুবুরি। ছবি: এএফপি/ ফাইল ছবি।

স্কুলপাঠ্য ‘একতাই বল’ গল্পে বৃদ্ধ পিতা ছেলেদের শিখাইয়াছিলেন, ঐক্যবদ্ধ থাকিলে বিপদ সহজে কাবু করিতে পারিবে না। নীতিকথাটি কতখানি খাঁটি, তাহার প্রমাণ মিলিল তাইল্যান্ডের থাম লুয়াং ন্যাং গুহার উদ্ধারকার্যের ঘটনাপ্রবাহে। ২০০০ সৈন্য, ২০০ ডুবুরি এবং প্রায় ১০০টি সরকারি সংস্থার প্রতিনিধি সমেত প্রায় হাজার দশেক উদ্ধারকারী মানুষ এবং গোটা পৃথিবীর প্রার্থনাকে সঙ্গী করিয়া অবশেষে উদ্ধার হইল ‘ওয়াইল্ড বোরস’ নামের ফুটবল দলটি। তাইল্যান্ডের ঘটনাটি ভারতের প্রিন্স উদ্ধারের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। কুরুক্ষেত্রের পরিত্যক্ত কূপে প্রায় পঞ্চাশ ঘণ্টা আটকাইয়া থাকিবার পর সেই পাঁচ বছরের শিশুটিকে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় বাহিরে লইয়া আসে সেনাবাহিনী। সারা ভারত সেই লড়াইয়ের দিনগুলিতে মানসিক ভাবে হরিয়ানা সরকার এবং সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়াইয়াছিল। শুধুমাত্র হরিয়ানার ঘরের সমস্যা ভাবিয়া এড়াইয়া যায় নাই।

Advertisement

সঙ্কীর্ণ অর্থে দেখিলে, পক্ষাধিক কাল গুহার অভ্যন্তরে আটক থাকা দলটির উদ্ধারকার্যের দায়িত্ব সেই দেশের সরকারের উপর বর্তায়। কিন্তু দায় তাইল্যান্ডের একার বলিয়া বাকি বিশ্ব চোখ ফিরাইয়া থাকিবে, অন্ধকার এখনও ততটা গাঢ় নহে! অতএব উদ্ধারকার্যের নকশা রচনা হইতে শুরু করিয়া একদম শেষ সদস্যটি গুহার বাহিরে আসিবার প্রতিটি মুহূর্তে যে হাতগুলি আগাইয়া আসিল, তাহাদের কোনওটি অস্ট্রেলিয়া, কোনওটি ব্রিটেন, কোনওটি আমেরিকা, কোনওটি ভারত হইতে আসিয়াছে। ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ভিন্ন, তবুও তাহারা এক হইয়াছে। প্রবল বিপদসঙ্কুল পথে কাঁধ মিলাইয়া লড়িয়াছে। তাইল্যান্ডের বাহিরেও যে মনগুলি রুদ্ধশ্বাসে এই গোটা অভিযানের খুঁটিনাটি দেখিতে গত কয়েক দিন যাবৎ টেলিভিশনের সামনে সজাগ থাকিয়াছে, তাহাদের প্রেক্ষাপটও আলাদা। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দেশের এই সমস্ত মানুষ তাঁহাদের আত্মপরিচয় পিছনে ফেলিয়া এক হইয়াছেন অন্য একটি দেশের কিছু প্রাণের স্বার্থে। হয়তো আটকাইয়া পড়া কিশোরদের নিতান্তই স্বল্প বয়স, হয়তো তাহাদের হার-না-মানিবার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, হয়তো দুই ব্রিটিশ ডুবুরির তোলা ছবিতে ধরা পড়া তাহাদের অসহায় মুখগুলিই এই মানবিক সংহতির কারণ। কিন্তু কারণ যাহাই হউক, বাস্তব হইল অনেকের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টারই ফল, এক অ-সম্ভবকে সম্ভবপর করিয়া তোলা। অক্ষত অবস্থায় প্রত্যেকের গুহার বাহিরে পা রাখা। যদিও প্রাণহানি একেবারে আটকানো যায় নাই। অক্সিজেনের অভাবে ম়ৃত্যু হইয়াছে এক ডুবুরির। একটি প্রাণহানির ঘটনাও দুঃখজনক। কিন্তু যেখানে এই সংখ্যা অনেক বেশি হইবার আশঙ্কাই প্রবল ছিল, সেখানে সেই সংখ্যাকে মাত্র ১-এ বাঁধিয়া রাখিতে পারা কৃতিত্ব বইকি।

বৃহদর্থে ইহা মানবতার কৃতিত্ব। যখন বার বারই বিশ্ব জুড়িয়া মানবতার অস্তিত্ব বিপন্ন বলিয়া শোরগোল ওঠে, তখন কিছু ঘটনা অপ্রত্যাশিত ভাবেই প্রমাণ করিয়া দেয় অস্তিত্ব বিপন্ন হইলেও তাহা এখনও সম্পূর্ণ মুছিয়া যায় নাই। আর মুছিয়া যায় নাই বলিয়াই বিপদ আসিলে এখনও কিছু স্বার্থগন্ধহীন হাত প্রসারিত হয়, যাহাদের অবলম্বন করিয়া পরিত্রাণের পথ খুঁজিয়া পাওয়া যায়। ইহাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। একের প্রয়োজনে অন্যের পাশে গিয়া দাঁড়ানো। এই কাজ যে সে সর্বদা স্বার্থহীন ভাবে করিয়া থাকে, তাহা হয়তো নহে। হয়তো স্বার্থ আছে। আত্মতৃপ্তির স্বার্থ। অন্যকে সাহায্য করিবার মধ্য দিয়া মানুষ এক ধরনের আত্মতৃপ্তির সন্ধান পায়। বোধ করি ইহার তাড়নাতেই সে বারংবার পড়শির বিপদের দিনে নিজের ঘরের ভাত-তরকারি পাঠায়, দুর্ঘটনা ঘটিলে পুলিশ-দমকল পৌঁছাইবার ঢের আগে স্থানীয়রাই উদ্ধারকার্যে হাত লাগায়, পরিত্যক্ত শিশুকে আশ্রয় দিতে দ্বিধাহীন ভাবে আগাইয়া আসে। তবে এই সত্যও অনস্বীকার্য যে, ক্ষুদ্র স্বার্থ ক্রমশ সেই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে নষ্ট করিয়া ফেলিতেছে। শিয়রে সমূহ বিপদের দেখা না মিলিলে সেই মানবতার দর্শন পাওয়া যায় না। অথচ এই প্রবৃত্তিকে বাঁচাইয়া রাখিতে পারিলে বিশ্বের অর্ধেক সমস্যার সমাধান হইয়া যাইত। অন্য রাজ্যের বা দেশের মানুষ বিপন্ন হইলে পড়শি রাজ্য, দেশ হইতে স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য আসিবে, এমনই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিক ঘটনাকেই বারংবার আটকাইয়া দেওয়া হয় কিছু ক্ষুদ্র ও অসার রাজনীতি এবং কূটনীতির অজুহাতে। এই বাধা অপসারিত হওয়াই কাম্য। মানবতার স্বার্থে। পৃথিবীর স্বার্থে।

Advertisement

সোশ্যাল মিডিয়া এমন গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ জিনিসে ভর্তি, ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে উঠলেই সেখানে ক্রোয়েশিয়ার সুন্দরী প্রেসিডেন্টের ছবি নিয়ে হুড়মুড় মন্তব্য শুরু হয়ে যায়। রূপসি নারীকে নিয়ে মুচকি কথাবার্তা অবশ্যই বলা যাবে, অন্যত্র আবার নারীকে কেউ ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখলে তাকে জম্পেশ গাল দিয়ে তালিও কুড়োনো যাবে, কিন্তু সম্পূর্ণ অবান্তর প্রসঙ্গ নিয়ে গুচ্ছ মাতামাতির জায়গাকে হৃদয়েশ্বর করলে, নিজেকে ভব্যিযুক্ত ভাবুক বাতলানো যাবে কি?

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন