মহারাজ মণিলাল সিংহদেও-র সমাধি। কাশীপুরে বড়বাঁধে। ছবি: লেখক।
কিনাইডি গ্রাম থেকে সকলের অগোচরে, রাতের আঁধারে ব্রাহ্মণ পিতা-পুত্র এক বালককে নিয়ে চুপিসাড়ে চলেছেন ছাতনার অভিমুখে। মানভূমের সীমানা পেরোলেই ছাতনা, সামন্তরাজ বিবেকনারায়ণের এলাকা। বিবেকনারায়ণ আশ্রয় দেবেন বালককে, এই প্রত্যাশা ছিল মনে। তবে যাত্রাপথে রচিত হল বিধাতার অন্য এক নাটক! সে রাতের সেই নাটকের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে আজকের পুরুলিয়া জেলার বাঁকুড়া সীমানা লাগোয়া মণিহারা গ্রাম।
ব্রাহ্মণের নাম অকিঞ্চন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পুত্র শোভারাম বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গের বালক ‘মণি’, পঞ্চকোট রাজ্যের নয়নের মণি, মণিলাল সিংহদেও। মণিকে নিয়ে পালাচ্ছিলেন অকিঞ্চন ও শোভারাম।
সময়টা ১৭৫০-এর কাছাকাছি। মানুষজন তখন নিদ্রামগ্ন। অরণ্যে দিক ঠাহর করা যায় না। ঘোড়ার পিঠে চলেছেন রাজপুত্র মণিলাল, পাশে অন্য ঘোড়ায় রাজ পুরোহিতের পুত্র শোভারাম। অকিঞ্চন অনেক পিছনে, কেউ অকস্মাৎ এলে ঠেকাতে হবে। সামনে ড্যাংরা নদী ও তার অববাহিকা। জঙ্গলাকীর্ণ। অকিঞ্চন অতন্দ্র প্রহরী।
এগিয়ে চলেছেন মণি ও শোভা। পাশাপাশি ঘোড়া অন্ধকারে ঠোক্কর খেয়ে চলেছে। কখনও এ দিক-ও দিক বেঁকে যায়, পথ খুঁজে চলে। এক সময় দুই ঘোড়ার অভিমুখ বদলে যায়। জঙ্গলের গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ঘুরতে থাকেন মণি ও শোভা। মণি গেলেন হারিয়ে। সেই থেকে জঙ্গলের নাম হয়ে গেল মণিহারা জঙ্গল।
মণি অবশ্য একেবারে হারিয়ে যাননি। ভোরের আলোয় তাঁর সন্ধান মিলেছিল। কিন্তু কেন এই লুকোচুরি। মণিই বা কেন রাজপুত্র হয়ে চোরের মতো অন্ধকারে সৈন্যহীন হয়ে চলেছেন? এ কোনও রূপকথা নয়। বরং রাজ-রহস্যে ভরা ‘থ্রিলার’ যেন। সেই রহস্য উন্মোচনে যেতে হবে অতীত মানভূমের পঞ্চকোট রাজবংশের শেষ পর্বের ইতিহাসে।
পঞ্চকোট রাজ্যের শেষ রাজধানী কাশীপুর এখন ‘হেরিটেজ’। সাম্রাজ্যের পতন ঘটে ১৯৭২ সাল নাগাদ। ৮০ খ্রিস্টাব্দে, ঝালদায় এই রাজ্যের সূচনা হয়। পুরুলিয়ার প্রাজ্ঞ ইতিহাস গবেষকদের দীর্ঘ গবেষণায় এই রাজবংশের প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস উঠে এসেছে। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে এই অরণ্যের এক রাতের গল্প একটি দিক নির্দেশক।
মণিহারা জঙ্গলে মণির হারিয়ে যাওয়া, খুঁজে পাওয়া, পরে জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন এবং ‘মণিহারা’ গ্রামটি স্থানীয় কিংবদন্তী হয়ে ওঠা— এ সব সত্য না হলে, শেষ রাজধানীও থাকত না। ইতিহাস বয়ে যেত অন্য খাতে, দ্বারকেশ্বরের তীরে গড়ে উঠত না পঞ্চকোট সভ্যতার নিদর্শন।
এই মণিকে ঘিরেই চলেছিল চক্রান্ত। মণির ঠাকুরদা মহারাজ শত্রুঘ্নশেখর রাজ-নিয়মে জ্যেষ্ঠ সন্তান ভিখমলালের তিলক ঘটিয়েছিলেন। ভিখমলালের তখন তিন জন সহোদর-সহ এগারো জন ভাই। রাজ্যাভিষেকের পরে, মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে ভিখমলাল ইহলোক ত্যাগ করেন।
সহোদরেরা তখন সিংহাসন প্রাপ্তির আশায় অন্তরে পুলকিত। সবার স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে মহারাজ শত্রুঘ্নশেখর প্রপৌত্র সাত বছরের মণিকে উত্তরাধিকারী নির্বাচিত করেন। ভিখমলালের একমাত্র সন্তান মণিলালের রাজতিলক বাকিদের ঈর্ষার কারণ হবে, এতে সন্দেহের কোনও অবকাশ ছিল না। তবুও মহারাজ সমস্ত দিক সামলে চলেছিলেন। ১৭৫০ সালে হঠাৎ শ্বাসকষ্টজনিত রোগে শত্রুঘ্নশেখর সিংহদেও দেহ রাখেন।
পঞ্চকোট রাজ্যের তিয়াত্তরতম মহারাজের এই প্রয়াণ দুর্যোগের সূচনা করেছিল স্বতঃসিদ্ধ ভাবে। মণিকে গ্রাহ্য না করে আত্মীয়েরা এক-একটি এলাকা দখল করেন এবং তার পরে মণিলালকে মেরে ফেলতে উদ্যত হন। অসহায় মণিলালের তখন আপনজন কোথায়! মা পিতার সঙ্গে সহমরণে গিয়েছেন, সন্তানের কথা না ভেবে। সহায় তখন কুলপুরোহিত অকিঞ্চন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই ওই লুকোচুরি এবং পাশের ছাতনার সামন্তরাজ বিবেকনারায়ণের কাছে আশ্রয়ের
জন্য যাওয়া। তবে কিনাইডি গ্রামে গোপনে মণিলালকে নিজের বাড়িতে কিছু দিন রেখেছিলেন অকিঞ্চন। কিন্তু চরদের চোখ এড়ানো যায়নি। অকিঞ্চন ক্ষত্রিয় সন্তানের সঙ্গে লড়াই করে কোনও মতে রক্ষা করেন মণিলালকে। সে দিনই মনে হয়, কিনাইডি যতই অখ্যাত ও সাধারণ গ্রাম হোক, এখানেও মণিলাল নিরাপদ নন। বাধ্য হয়ে রাতের নিশ্চুপ যাত্রা।
পরের ইতিহাস পঞ্চকোট রাজবংশের উজ্জ্বলতম ইতিহাস। ছাতনারাজের কাছে পঞ্চকোটবাসী চিরকৃতজ্ঞ। মণিলাল সিংহদেও হলেন ৭৪তম রাজা এবং সংস্কৃতি ও সংগ্রামে পঞ্চকোট রাজবংশের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তিনি কিশোর বয়সেই ছাতনারাজের আশ্রিত হয়ে থাকতে চাননি। তাঁর একমাত্র ‘সম্বল’ ঘোড়া দিয়ে একটি গ্রাম কিনে সেখানেই থাকতেন। সে গ্রামের নাম হয়ে যায় ‘ঘোড়ামুখি’। এতটাই স্বাধীনচেতা ছিলেন মণিলাল ছোট থেকেই।
এ দিকে পঞ্চকোটের প্রজারা যখন জানতে পারলেন মণিলাল জীবিত এবং ছাতনাতে আছেন, তখন দলে দলে এসে অনুরোধ করলেন রাজত্বে ফিরে গিয়ে হাল ধরতে। প্রজাদের বিপর্যস্ত হাল মণিলালকে ব্যথিত করে। তিনি বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁর কাছে সমস্ত বিবরণ পেশ করেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজের রাজত্বে ফেরেন ১৭৫২ সালে। তবে পঞ্চকোট রাজগৃহে ফেরেননি তিনি। অন্য একটি স্থানে গড় নির্মাণ করলেন তিনি। নাম হল মহারাজনগর। মহারাজা মণিলাল সিংহদেও-র নতুন ভবন। কিছু সময় পরে, তিনি ১৭৬২ সালে কাশীপুর এলাকায় রাজধানী স্থাপন করেন।
জনহিতকর ও প্রজাকল্যাণের বহু কর্মধারায় নিজেকে নিয়োজিত করে মণিলাল সিংহদেও ১৭৯২ সালে মারা যান। কাশীপুরে বড়বাঁধের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে মহারাজ মণিলালের সমাধি মন্দিরে এখনও শ্রদ্ধাবনত হন স্থানীয় বাসিন্দারা।
লেখক কাশীপুর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ