প্রবন্ধ ১

ছোট চাষির জন্য কী করলেন মমতা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আড়তদারদের কাছে ধান যেন না বিক্রি করেন চাষিরা। পাঁচ বছর পরে বাংলার চাষি সেই তিমিরেই। ভোটের মরসুমে এই অপরিবর্তনের গল্পটা বোঝা দরকার। দিদির কথা রাখা যায়নি। শ্রীমন্ত ঘোষের চোখেমুখে সেই আফশোস স্পষ্ট। বীরভূমের হাতিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের মোরদিঘি গ্রামে সব চাইতে বড় ধানের আড়তদার শ্রীমন্তবাবু। তৃণমূলের অঞ্চল নেতাও বটেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন, শ্রীমন্তবাবুর মতো ব্যবসায়ীদের কাছে ধান যেন না বিক্রি করেন চাষিরা।

Advertisement

স্বাতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০১৬ ০০:২৬
Share:

দিদির কথা রাখা যায়নি। শ্রীমন্ত ঘোষের চোখেমুখে সেই আফশোস স্পষ্ট। বীরভূমের হাতিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের মোরদিঘি গ্রামে সব চাইতে বড় ধানের আড়তদার শ্রীমন্তবাবু। তৃণমূলের অঞ্চল নেতাও বটেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন, শ্রীমন্তবাবুর মতো ব্যবসায়ীদের কাছে ধান যেন না বিক্রি করেন চাষিরা। চাষির লাভের গুড় কেন খেয়ে যাবে ফড়িয়া-দালালরা? তাই সরকারি শিবির থেকে চেক নিতে বলেছিলেন চাষিদের।

Advertisement

ফের নির্বাচন এসে গেল। দেখা যাচ্ছে, মোরদিঘি গ্রামের ৮৫-৯০ শতাংশ ধানই কিনেছেন মমতা-অনুগামী শ্রীমন্ত। এ বছর ধানের বাজার মন্দ। তাই তাঁর কাছে সরকারি দরের চাইতে কুইন্টালে ৩৫০-৪০০ টাকা কম পেয়েছেন মোরদিঘির অধিকাংশ চাষি। সরকারি দর যাঁরা পাচ্ছেন, তাঁরাও চাষি কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। জেলায় জেলায় ‘ওপেন সিক্রেট,’ ব্যবসায়ীরাই চাষিদের থেকে সস্তায় ধান কিনে সরকারি মূল্যে তা বিক্রি করছেন। চাষির নামে লেখা চেক ব্যবসায়ীর হাত থেকে নেয় চাষি, টাকা ফের তুলে দেয় ব্যবসায়ীকেই।

এতে চাষি পাচ্ছেন কুইন্টালে ৩০০-৩৫০ টাকা কম। যদি ধানের দর চড়ার জন্য অপেক্ষা করা যেত, তা হলেও কিছু বেশি মিলত। কিন্তু ধান ব্যবসায়ী, সারের আড়তদারের কাছে ধার শোধের এমন চাপ, যে ধান উঠলেই তড়িঘড়ি বিক্রি করতে হয়। ফলে না সরকারি দর, না ঠিকঠাক বাজার দর, কোনওটাই মিলছে না চাষির। ২০১১-১২ সালে সরকারি মূল্যে কেনা হয়েছিল ২০ লক্ষ মেট্রিক টন ধান। এ বছর এখনও অবধি কেনা হয়েছে ৩৫ লক্ষ মেট্রিক টন ধান। কিন্তু চাষির লাভ বাড়ছে কই?

Advertisement

ভোটের মরসুমে তাকাতে হবে এই ‘অপরিবর্তন’-এর গল্পের দিকে।

চাষি কেন সরকারকে ধান বিক্রি করেন না, এ প্রশ্ন তুললেই চাষি বলেন, ‘অত হ্যাপা পোয়াবে কে’? সরকারকে ধান বেচতে ‘টোকেন’ বা ‘স্লিপ’ চাই। আট-দশটা গ্রামের থেকে মাত্র শ’খানেক বস্তা ধান কেনা হবে। নেতা ধরে যদি বা মেলে টোকেন, গাড়ি, লেবার, বস্তা ভাড়া করতে চলে যাবে ১৫০-২০০ টাকা। ধান নিয়ে আগের রাত থেকে লাইন দেওয়ার হ্যাপা আছে। কুইন্টালে কত ‘ঢলতা’, মানে কত ধান বাদ যাবে ময়েশ্চারের জন্য, সে দরাদরিতে ঠকার ভয় আছে। আর এত কিছু করে যদি বা চেক মিলল, তার টাকা আসতে পনেরো দিনও লাগতে পারে, তিন মাসও লাগতে পারে। চাষি ফের চাষে নামবে কী করে?

কিন্তু হ্যাপা নিয়ে বিরক্তি হল চাষির মুখের কথা। মনে সে জানে, ব্যবসায়ীকে ধান না বেচে উপায় নেই। চাষির টিকি বাঁধা সেখানে।

ভিক্টোরিয়া থেকে মমতা

তপন রায়চৌধুরীর স্মৃতিকথায় বরিশালের দুই চাষির গল্প আছে। প্রবল বৃষ্টিতে মাঠে কাজ করতে করতে এক জন আর এক জনকে বলছে, ‘বল দেহি, রানি ভিক্টোরিয়া এহন কী করে’? অন্য জনের উত্তর, ‘হে কি আর আমাগো মতো? পানি নামতেই পান্তা খাইয়া, কাঁথামুড়ি দিয়া উব্বুত।’

এ গল্পের হাস্যরস চাষির কল্পনার দৌড়ে। সানকি-ভরা পান্তা আর কাঁথামুড়ির চাইতে আরাম সে ভাবতে পারে না। করুণরস শাসকের বিচ্ছিন্নতার বহরে। চাষির কষ্টে ঔপনিবেশিক সরকারের ঘুমের ব্যাঘাত হয়নি। মা-মাটি-মানুষের সরকারের হচ্ছে কি?

যে শর্তে চাষ করছে রাজ্যের অধিকাংশ চাষি, তা দেখলে যে কারও ঘুম ছুটতে বাধ্য। চাষি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে যে ছবিটা স্পষ্ট হয় তা হল, বন্ধক ছাড়া নগদে ধার করতে হলে সুদ অত্যন্ত চড়া— মাসে ৫-১০ শতাংশ, বছরে যা ৬০-১২০ শতাংশে দাঁড়ায়। আর ধার যখন সার-কীটনাশকের জন্য, তখন ধানের একটা বড় পরিমাণ বাঁধা পড়ে যায় আড়তদারের গদিতে। ধান ওঠার পর, বাজারদর যখন সব চাইতে কম, সেই দরে ধান দিয়ে ধার শোধ করে চাষি। গত বছর এপ্রিলে যখন বোরো ধান ওঠে, দাম ছিল ৯১৬ টাকা কুইন্টাল। মন্তেশ্বরের এক ব্যবসায়ী হিসেব করে বললেন, তখন যে চাষি ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন, বিঘেতে ১৬১৬ টাকা ক্ষতি হয়েছে তাঁর। অগস্টে সেই দর উঠেছিল ১৩৩০ টাকা। ধান ধরে রাখতে পারলে বিঘেতে ২১১০ টাকা লাভ হত।

সেটা সম্ভব হত, যদি কৃষিঋণ মিলত। যার সুদ কম, শোধ করার মেয়াদ দীর্ঘ। মুখ্যমন্ত্রী নানা জনসভায় দাবি করেন, ৮০ শতাংশ চাষির কাছে কার্ড বিলি হয়ে গিয়েছে। তথ্য বলছে অন্য কথা। ২০১২ সালে প্রতি এক হাজার গ্রামীণ পরিবারের মাত্র ৪১টিতে কিষাণ ক্রেডিট কার্ড ছিল। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে কৃষিঋণের টার্গেট পূরণে ফাঁক ক্রমশ বেড়েছে। কার্ড পিছু ঋণ কমেছে ২০১৩ সালে ৫৭ হাজার টাকা থেকে ২০১৪ সালে ৫৪ হাজার টাকা— বলছে নাবার্ড। মহাজনি ঋণের উপর গ্রামীণ পরিবারের নির্ভরতা বোঝা যায়, যখন দেখা যায় যে, যত পরিবারের নগদ ঋণ বাকি আছে, তাদের তিনটের একটাই ৩০ শতাংশেরও বেশি হারে সুদ দিচ্ছে।

চাষির এই দুর্দশার কথা উঠলেই সবাই ভারী অবাক ভাব দেখায়। ‘চাষ করে যদি লাভ না-ই হয়, তবে চাষি চাষ করে কেন?’

যেন বঙ্গদেশের কৃষক বরাবর লাভ দেখে চাষ করেছে। ১৯৩০ সালে ব্যাঙ্ককর্তাদের একটা কমিটি বাংলার চাষিদের নিয়ে রিপোর্টে লিখেছিল, ‘‘এক ধরনের দারিদ্র আছে, যা একেবারে নিঃস্ব করে না, কিন্তু জীবন অনিশ্চিত, ঝুঁকিপূর্ণ করে। এই অনিশ্চয়তাই চাষিকে ক্রমাগত ঋণ নিতে বাধ্য করছে।’’ ‘খাজনা দেব কীসে’, সেই চিন্তার চাইতে চাষিদের অনেক বড় দুশ্চিন্তা, ঋণ শুধব কীসে। রিপোর্ট বলছে, বাংলার চাষিদের তখন বকেয়া ঋণ ছিল ১০০ কোটি টাকা— নগদে ৯৩ কোটি, শস্যে ৭ কোটি। সেখানে জমির খাজনা বাকি ছিল মাত্র ১৫ কোটি টাকা।

অ-পরিবর্তনের সূত্রটা হয়তো মেলে এইখানে। এ রাজ্যে ভূমিসংস্কার হয়ে জমির মালিকানা এসেছে অনেক চাষির হাতে, তাই খাজনা থেকে চাষি বেঁচেছে। কিন্তু জমির সঙ্গে চাই পুঁজিও। তার অভাব চাষিকে বিপন্ন করেছে বেশি। পরাধীন ভারতে এক দীর্ঘ সময় চাষির উৎপাদনের উদ্বৃত্ত কব্জা করার মূল উপায় ছিল ঋণ। তিরিশের দশকে বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা, তার পর দেশভাগ, জমিদারি বিলোপে মহাজন-জমি-মালিকের বজ্রমুষ্টি দুর্বল হয়েছে, কিন্তু তারা হাত গুটোয়নি। বামফ্রন্ট আমলে অপারেশন বর্গা ভূমিহীন চাষিকে চাষের অধিকার দিলেও, ঋণ জোগাল না। (ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালে মমতা বলেছিলেন, তিন শতাংশ বর্গাদারের কিষাণ ক্রেডিট কার্ড রয়েছে।)

বাংলার চাষির ইতিহাস ঘেঁটে যিনি কথাটা তুলে ধরেছেন, তিনি এখন তৃণমূলের সাংসদ, সুগত বসু। দেখিয়েছেন, ঋণ কী ভাবে চাষিকে পুষ্টও করে, রিক্তও করে। চাষির সমস্যা কোথায়, তা বুঝতে তৃণমূল সরকারের ভুল হওয়ার কথা ছিল না। নেতৃত্ব যে উদাসীন ছিল, এমনও নয়। নইলে চাষিকে চেক দেওয়া, কিংবা ব্লকে ব্লকে মান্ডি তৈরিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নিতেন না মমতা। তবু যে কিছু বদলায়নি, তার সূত্রটাও হয়তো মেলে ইতিহাসের আর এক অধ্যায় থেকে।

সেটা ১৯৪২ সাল। জাপানিদের হানার ভয় পাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। চাল যাতে শত্রুর হাতে না পড়ে, তাই বাড়তি ধান-চাল কেনার হুকুম দিলেন বাংলার গভর্নর। সরকার নিযুক্ত এজেন্টরা গ্রামে গিয়ে পড়ল ফাঁপরে। চাষি ও ব্যবসায়ীর লেনদেন দীর্ঘমেয়াদি, জটিল ও সূক্ষ্ম। সবই ‘চলতি খাতা,’ কিছু নগদ কিছু ধারে চলছে বছরভর। সেই লেনদেনের বাইরে ধান বেচতে রাজি হয়নি চাষি বা ব্যবসায়ী, কার্যত ধান লুট করতে হয়েছে এজেন্টদের। সরকারি এজেন্ট পাঠানোর প্রতিবাদ করে বেঙ্গল রাইস মিল অ্যাসোসিয়েশন লিখেছিল, ‘চাষিদের সঙ্গে ব্যাপারি, পাইকার, ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে একাধিক প্রজন্মের। তাদের পরস্পর প্রভাব ও দায়বদ্ধতা বিপুল।’ গবেষক জনম মুখোপাধ্যায়ের (হাংরি বেঙ্গল, হার্পার কলিন্স) এই বিবরণ পড়লে আন্দাজ হয়, কেন বহু কোটি টাকা ব্যয়ে মান্ডি তৈরি করলেও তা ফাঁকা পড়ে থাকছে, বেশি টাকার চেক দিতে চাইলেও চাষি নিতে আসছেন না।

এ রাজ্যে ধান্য ব্যবসায়ী সমিতির ৪০ হাজার সদস্য। প্রত্যেকের সঙ্গে যুক্ত ২০০-৩০০ চাষির পরিবার। সারা বছর ঋণদান, ধান উঠলে গদিতে জমা, চাষির যখন যেমন দরকার নগদ নেওয়া— এই জটিল ব্যবস্থাকে এককালীন লেনদেনের ছকে ফেলা যাবে না। চাষির সামনে এর বিকল্পই বা কী? গ্রামে
পা রাখলে একটা কথা বোঝা যায়— সমবায় থেকে নিয়ন্ত্রিত বাজার, চালকল থেকে সরকারি শিবির, যেগুলোকে সরকার ‘বিকল্প’ বলে দেখাতে চাইছে, সেই সব সর্ষের মধ্যেই ঢুকে আছে ভূত। আড়তদাররা নিয়ন্ত্রণ করছে
গোটা ব্যবস্থাকে।

চাষিকে জমি দিতে যথেষ্ট সংঘাত করতে হয়েছিল বামফ্রন্টকে। চাষিকে পুঁজির জোগান দিতে মমতা অতটা সংঘাতে যাবেন কি না, আসল প্রশ্ন সেটাই। গ্রামীণ এলাকায় যাঁরা তাঁর মনসবদার, তাঁরা ঋণগ্রস্ত চাষি নন, শ্রীমন্ত ঘোষের মতো উত্তমর্ণ ব্যবসাদার। মমতা কেনই বা তাঁদের চটাতে যাবেন? ইতিহাসও দেখিয়ে দিচ্ছে, রাজনীতির হিসেবে চাষির স্থান কোথায়। ১৯৪২ সালে সরকারের চাল মজুত করা থেকে তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সূচনা। সেই সময়ে অ্যাসেম্বলিতে ফজলুল হক ও তাঁর সঙ্গী মন্ত্রীরা এ নিয়ে ফাটাফাটি করেছিলেন। জোর করে ধান কেনার প্রতিবাদে নয়। ধান কেনার এজেন্টদের মধ্যে তাঁদের লোক নেই কেন, সেই ক্ষোভে। শেষে তাঁদের মনোনীত আরও চার এজেন্টকেও ধান কিনতে নিয়োগ করে সরকার। দুর্ভিক্ষের মুখে দাঁড়িয়ে ভোটে-জেতা প্রতিনিধিরা ধানের ভাগ চেয়েছিলেন।

চাষির ধান পাবে ব্যবসায়ী, ভোট পাবে নেতা। চাষি কী পাবে?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement