একটি ভাষা, অনেক লিপি

সাওতালি ভাষায় চালু হল উইকিপিডিয়া।

বাংলাদেশ ও ভারতের সাঁওতালদের যৌথ প্রচেষ্টায় অগস্ট মাসের গোড়ায় উইকিপিডিয়া ফাউন্ডেশন ‘সাঁওতালি উইকিপিডিয়া’ চালু করল। এই প্রথম ভারতের কোনও আদিবাসী ভাষা অনলাইন বিশ্বকোষটির অন্তর্ভুক্ত হল। এর ফলে ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালে এক কোটিরও বেশি সাঁওতালি-ভাষী মানুষ মাতৃভাষায় জ্ঞান বিনিময় করতে পারবেন। দুই দেশের সাঁওতালদের যৌথ উদ্যোগও এই প্রথম। 

এই মুহূর্তে এই বিশ্বকোষে পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু, সাঁওতালি ভাষা, অলচিকি লিপির উপর নিবন্ধ ছাড়াও সাঁওতাল জীবন ও সংস্কৃতির উপর গুরুত্বপূর্ণ অনেক বইয়ের তথ্য দেওয়া আছে। তবে এখনও সাঁওতালি ভাষার নিবন্ধের তুলনায় বেশি নিবন্ধ ইংরেজিতে। বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বকোষের কাজ সবে শুরু হয়েছে।  

২০০৩ সালে সাঁওতালি অষ্টম তফসিলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সাঁওতালি ভাষার চর্চা ও প্রসার নিয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ চোখে পড়ে। এই বছর মাধ্যমিকে প্রথম বার সমস্ত বিষয়ে অলচিকি লিপিতে পরীক্ষা দেওয়া শুরু হল। পশ্চিম মেদিনীপুরের সাঁওতাল মেয়ে শিখা মান্ডি এই বছরই প্রথম এফএম রেডিয়োতে সাঁওতালি ভাষায় ধারাভাষ্য পরিবেশন করলেন। জেনিভায় রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক সাংসদ সম্মেলনে ঝাড়গ্রামের সাংসদ চিকিৎসক উমা সরেন সাঁওতালিতে বক্তৃতা দেন। সাঁওতালি উইকিপিডিয়ার সংযোজন নিঃসন্দেহে সাঁওতালি ভাষাকে বহির্বিশ্বে পরিচিতি দেবে।

কিন্তু সেই সঙ্গে উঠেছে বিতর্কও। কারণ, সাঁওতালি উইকিপিডিয়াতে ব্যবহার করা হয়েছে কেবল অলচিকি লিপি।

সাঁওতালি ভাষা বহু লিপিতে লেখা হয়। বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যে বসবাসের জন্য সঙ্গত কারণেই সাঁওতালরা বাংলা, দেবনাগরী, অসমিয়া, নেপালি, ওড়িয়া, রোমান প্রভৃতি লিপিতে মতবিনিময় ও সাহিত্যচর্চা করে আসছেন। পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আবিষ্কৃত অলচিকি লিপি অনেকেই জানেন না, ব্যবহারও করেন না। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে সিংহভাগ সাঁওতালি বই ও পত্রিকা বাংলা লিপিতে প্রকাশিত হয়। সেগুলির লেখক ও পাঠক সংখ্যাও অনেক বেশি। সাঁওতালি ভাষার উপর গবেষণাও অলচিকির তুলনায় ইংরেজি, বাংলা ও দেবনাগরী লিপিতে অনেক বেশি ছাপা হয়। কেবল অলচিকি লিপিতে কি অনলাইন বিশ্বকোষ চালানো সম্ভব? 

‘সাঁওতালি উইকিপিডিয়া’ প্রস্তুত করেছেন যাঁরা, তাঁদের অন্যতম মানিক সরেন জানালেন, মুখ্যলিপির জন্য ইউনিকোড রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন, যা অলচিকি ছাড়া অন্য কোনও লিপির ছিল না। অলচিকির সঙ্গে সাঁওতালদের জাতিগত ভাবাবেগও জড়িয়ে আছে, তাই তা গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁর আশ্বাস, ‘‘অন্যান্য লিপির সাঁওতালি লেখাগুলি অলচিকিতে তর্জমা করে নথিভুক্ত করা হবে।’’

তর্জমা-সাহিত্যের নিজস্ব মূল্য নিশ্চয় আছে, তবে একটি বিশ্বকোষ পুরোপুরি তর্জমার উপর নির্ভরশীল হলে তার উদ্দেশ্যটা ব্যাহত হয় না কি? উন্মুক্ত বিশ্বকোষে সংযুক্ত হওয়ার প্রযুক্তিগত দাবি মেটাতে সাঁওতালি ভাষা তার লিপির বিভিন্নতার ঐতিহ্যের সঙ্গে কতটা আপস করবে, সেটাও আলোচনার বিষয়। আর, জাতিসত্তা ও আবেগের ভিত্তিতে কোনও একটি লিপিকে অগ্রাধিকার দিলে, অন্যান্য লিপিতে লিখিত সাহিত্যকর্মের অবদানকে লঘু করাও হয়। 

‘সাঁওতালি উইকিপিডিয়া’ নিয়ে তাই অন্যান্য লিপির লেখকরা চিন্তিত। ২০০১ সালে পবিত্র সরকার কমিশন অলচিকিকে সাঁওতালদের একমাত্র লিপি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সরকারি সহযোগিতার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু অন্যান্য লিপিতে যে সাঁওতালি পঠনপাঠন বা সাহিত্যচর্চা করা যাবে না, এমন কোনও নির্দেশিকা দেয়নি। নিজের পছন্দের লিপিতে বিদ্যাচর্চা করা একটি সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু লেখকদের অভিযোগ, অলচিকি ছাড়া অন্যান্য লিপিতে লেখা সাঁওতালি পুস্তকগুলি কোনও সরকারি পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হচ্ছে না। আদিবাসী উন্নয়ন দফতরের বাৎসরিক অনুষ্ঠান ‘আদিবাসী গুণিজন সংবর্ধনা’ থেকে শুরু করে সাঁওতালি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার নির্বাচনেও অলচিকি ছাড়া অন্যান্য লিপিতে লেখা সাঁওতালি পুস্তককে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শঙ্কার বিষয় হল, সাঁওতালি উইকিপিডিয়াও এখন সেই তালিকায় যুক্ত হল।

সাঁওতালি লেখক সারদাপ্রসাদ কিস্কু গত ত্রিশ বছরে ত্রিশটার বেশি সাঁওতালি পুস্তক বাংলা লিপিতে লিখেছেন। তিনি এই পক্ষপাতিত্বের শিকার। তাঁর বক্তব্য, ‘‘অন্যান্য লিপির সাঁওতালি পুস্তকগুলি সেই সময়কার সাঁওতালদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার এক একটি দলিল। সেগুলিকে বর্জন করে আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছি, যা একটা জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্তরায়। তাতে সাঁওতাল সাহিত্যের সামগ্রিক চিত্র ফুটে ওঠে না।’’

বর্তমানে সাঁওতালরা লিপি ও ধর্ম নিয়ে নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত। লিপির সঙ্কীর্ণতা ছেড়ে সকল লিপির সাঁওতালি লেখাকে বিশ্বকোষে স্থান দিলে সাঁওতালি উইকিপিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা যেমন বাড়ত, তেমনই লেখার গুণমান বজায় রাখাও সহজ হত। বিভিন্ন প্রদেশের সাঁওতালদের মধ্যে লিপি ও ধর্ম নিয়ে যে বিভাজন, তার সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হত ভাষা, শিল্প ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে। উইকিপিডিয়া উন্মুক্ত চিন্তার প্রতীক। সেখানে বিশেষ কোনও লিপিকে প্রাধান্য দিয়ে উইকিপিডিয়া ফাউন্ডেশন নিজের আদর্শের সঙ্গেই সংঘাতে জড়াল। সাঁওতালদের মধ্যে বিভেদকেও গভীর করল। সাঁওতালি উইকিপিডিয়ার নির্মাতারা এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলি নজরে রাখলে ভাল করতেন।