প্রবন্ধ ১

এক মনে

অর্থ, পণ্য ও প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া একা হাতে লিখে ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ প্রণেতা যা পেরেছিলেন, আজ আমরা সবাই মিলেও তা পারি না!শ্রা বণ মাস। ঘন বর্ষা। ঠাকুরবাড়ির জমিদারির কালীগ্রাম পরগনার সদর কাছারি পতিসরে সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হলেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। অর্থাভাবে কলেজের থার্ড ইয়ারেই পড়াশোনায় ইতি। তবে পড়ার মনটি ছিল ষোলো আনা।

Advertisement

বিশ্বজিৎ রায়

শেষ আপডেট: ২৪ জুলাই ২০১৬ ০০:০০
Share:

নিবিষ্ট। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৬৭-১৯৫৭) ছবি: পরিমল গোস্বামী

শ্রা বণ মাস। ঘন বর্ষা। ঠাকুরবাড়ির জমিদারির কালীগ্রাম পরগনার সদর কাছারি পতিসরে সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হলেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। অর্থাভাবে কলেজের থার্ড ইয়ারেই পড়াশোনায় ইতি। তবে পড়ার মনটি ছিল ষোলো আনা।

Advertisement

ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে একটা যোগ ছিল। পিসতুতো ভাই যদুনাথ চট্টোপাধ্যায় দেবেন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে খাজাঞ্চির কাজ করতেন। বালক হরিচরণ দাদার মুখে হাঁ করে শুনত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে রবীন্দ্রনাথের কথা— কবিতা লেখেন, পড়াশোনার প্রতি গভীর অনুরাগ। সেই কবির সঙ্গে এক দিন দেখাও করতে হল ছাত্র হরিচরণকে, উদ্দেশ্য অর্থসাহায্য লাভ। জোড়াসাঁকোর দোতলার ঘর, জাজিমপাতা বিছানা। হরিচরণ ‘আত্মপরিচয়’ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর এই প্রথম দেখার কথা প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘আমি কবির নিকট একপাশে বসিলাম।’

রবীন্দ্রনাথ মাসিক কিছু সাহায্যের ব্যবস্থা করলেন। তবে নানা জনের সাহায্য নিয়ে পুরো ছাত্রজীবন অতিবাহিত করা সম্ভব ছিল না। তাই পড়াশোনা শেষ না করেই কাজে নামা। সেই কাজের খোঁজেই আবারও কবির সাহায্য প্রাপ্তি। হরিচরণকে বর্ষায় পতিসরে যেতে হল। ম্যানেজার শৈলেশচন্দ্র কাছারিতেই কাজ দিলেন, কাজ শেখাতে লাগলেন। কাজ শেষে সন্ধেবেলা হরিচরণ সংস্কৃত পড়তেন, বই লিখতেন। এক দিন রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করলেন হরিচরণকে, ‘দিনে সেরেস্তায় কাজ কর, রাত্রিতে কী কর?’ কবির এ প্রশ্ন যেন শুধু প্রশ্ন নয়, আরও কিছু। হরিচরণ বলেছিলেন, ‘কিছুক্ষণ সংস্কৃতের আলোচনা করি ও কিছুক্ষণ একখানি বইয়ের পাণ্ডুলিপি দেখে প্রেসের কপি প্রস্তুত করি।’ কবি পাণ্ডুলিপি দেখতে চাইলেন। তার পর শান্তিনিকেতনে ফিরে গিয়ে ডাক দিলেন সেরেস্তার কর্মচারীকে। কবির বিদ্যালয়ে হরিচরণ অধ্যাপনার কাজ পেলেন। পরে আত্মপ্রকাশ করলেন অভিধানকার হিসেবে।

Advertisement

কবির ‘একপাশে’ হরিচণের বসার কথাটি অর্থবহ। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ নামে বাংলা সাহিত্যের সুবৃহৎ যে অভিধানটি তিনি বছরের পর বছর লেগে থেকে একা হাতে নির্মাণ করেছিলেন, তা পড়লে বোঝা যায় তাঁর শব্দসন্ধান পদ্ধতিতে কাব্যসাহিত্যের ভূমিকা ছিল গভীর। ছাত্রজীবনে হাতে পাননি বলে পড়তে পারেননি, শান্তিনিকেতনে সংস্কৃত ও বাংলা শাস্ত্র, কাব্য যা পেলেন আকণ্ঠ পান করলেন। ব্যক্তিজীবনেই কেবল কবির অনুগামী নন, অভিধানকার হিসেবেও তিনি ছিলেন কাব্যসাহিত্যের অনুগামী সাহায্যপ্রার্থী। শব্দের ব্যুৎপত্তি ও মানে বলেই তিনি থেমে যান না। একটি শব্দ কত বিভিন্নার্থে ব্যবহৃত হতে পারে শাস্ত্র-কাব্য-সাহিত্য থেকে নানা উদাহরণ দিয়ে তিনি তা দেখান। অভিধান যে মৃত কোষগ্রন্থ নয়, একটি জীবন্ত ভাষার ঐতিহাসিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরম্পরার বার্তাবাহী, হরিচরণ দেখালেন।

বাংলা ভাষায় যেমন সংস্কৃতের উত্তরাধিকার আছে, তেমনই অ-সংস্কৃত নিজস্ব উপাদানও কিছু কম নেই। সাহেবরা যখন এ দেশে এসেছিলেন তখন বাংলা ভাষার অভিধান তাঁদের কাছে ভাষা শেখার ও ভাষা বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেওয়ার অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। উইলিয়াম কেরি তাঁর বাংলা অভিধানের ভূমিকায় বাংলাকে সংস্কৃতের হাতফেরতা ভাষা হিসেবেই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। জয়গোপাল তাঁর চটি ‘পারসীক অভিধান’-এ বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দ হটিয়ে বিকল্প সংস্কৃত শব্দপ্রয়োগের নিদান দিয়েছিলেন। ‘দোকান’ লেখা চলবে না, ‘বিপণি’ লিখতে হবে, এই ছিল তাঁর দাওয়াই। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অভিধানের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে হিন্দু সংস্কৃতির সন্তান হিসেবে যখন পণ্ডিতেরা পরিশুদ্ধ করে নিতে চাইছিলেন তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির আদালতে বাংলা ভাষা কাজের ভাষা রূপে গৃহীত হচ্ছিল। ‘মুসলমান’ শাসন থেকে ‘ইংরেজ’ শাসন যে ভাল, হিন্দু-বাঙালির মাথায় তা ঢোকানো হচ্ছিল।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালি ভাষা-ভাবুকেরা যে বাংলা ভাষা তৈরি করতে চাইছিলেন, তাতে কিন্তু নানা মিশেল অনিবার্য ছিল। রবীন্দ্রনাথ উনিশ শতকের শেষে ছোট ছোট লেখায় বাংলা ভাষার নিজস্ব অ-সংস্কৃত রূপ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন। উনিশ শতকের শেষ দশকে গড়ে ওঠা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও ক্রমে গড়ে ওঠা তার শাখাগুলি বাংলা ভাষার নানা কথ্যরূপ ও উপাদান সম্বন্ধে আমাদের সচেতন করছিল। ক্রমশই দরকার হয়ে পড়ছিল বাংলা ভাষার বিচিত্র পরিসরকে ধারণ করার মতো বড় একটা অভিধান। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, সুবলচন্দ্র মিত্র, রাজশেখর বসুর অভিধান ছিল। তবে বাংলা ভাষায় প্রচলিত শব্দের বিস্তৃত প্রয়োগ তুলে ধরার পক্ষে সেগুলি যথেষ্ট ছিল না। হরিচরণ তাঁর অভিধানের কাজ শেষ করেছিলেন কিন্তু বিশ্বভারতী, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই তিন প্রতিষ্ঠান প্রকাশ করবে বলেও টাকার টানাটানিতে তা প্রকাশ করতে পারেননি। নিজের পয়সায় প্রাচ্যবিদ্যার্ণব নগেন্দ্রনাথ বসুর বিশ্বকোষ প্রেস থেকে ছোট ছোট খণ্ডে অভিধানটি শেষ অবধি ছাপা হয়।

‘সংস্কৃতপন্থী’ না হলেও সংস্কৃতজ্ঞ হরিচরণ বুঝেছিলেন, নীতি ও শৃঙ্খলা ছাড়া অভিধান তৈরি অসম্ভব। ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক শব্দকোষ’ নামে ছোট্ট এক লেখায় তিনি প্রাদেশিক শব্দকোষ নির্মাণের পদ্ধতিগুলি নির্দেশ করেছিলেন, কোনও শব্দকে বাদ দিতে চাননি। বলেছিলেন, যাচাই করে নিতে হবে ‘সেয়ানা’ ‘সজ্ঞান’ থেকে এসেছে কি না, ফারসি ‘যখ্‌নী’ থেকে ‘আখনী’ কি না। শব্দের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত, উপাখ্যান, সামাজিক আচারবিচারের যোগ থাকলে তাও দেওয়া চাই। না হলে শব্দ হবে ‘নিরর্থক ও নীরস।’

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মাঝে মাঝে শান্তিনিকেতনে হরিচরণের অভিধান তৈরির ঘরে যেতেন। ছোটবড় নানা অভিধানে ভরা তক্তপোষ। বাংলা, সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, ফার্সি, হিন্দি, উর্দু, গুজরাতি, ইংরেজি, নানা ভাষার অভিধান। দু-একটা কথা বলে হরিচরণ নিজের কাজে ডুবে যেতেন। সাহেবরা যা টিমওয়ার্ক দিয়ে করেন, তিনি একা তা করতেন। তিনি কুয়োর ব্যাং নন: প্রাচীন সংস্কৃত বিদ্যাচর্চার শৃঙ্খলা তাঁর ছিল, সংকীর্ণতা ছিল না। অপর ভাষার নতুন-পুরনো অভিধানের সঙ্গে নিজের কাজের তুলনা করতেন।

আর ছিল নিজের কাজের বিষয় গভীর প্রেম। সে প্রেম না থাকলে পতিসরে ঘন বর্ষায় সেরেস্তার কর্মচারী সন্ধেবেলা এক মনে সংস্কৃত চর্চা করতেন না। নিত্যদিনের যে কাজ তার বাইরে মানুষ যা কিছু করে তাকেই রবীন্দ্রনাথ ‘সংস্কৃতি’ মনে করতেন। তাঁর জাজিমের একপাশে বসা মানুষটি বাংলা ভাষার সংস্কৃতির রূপকার। হরিচরণ অর্থ, পণ্য ও প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া একা হাতে লিখে যা পেরেছিলেন আজ আমরা বাঙালিরা সবাই মিলেও তা পারি না! বর্ষা প্রতি বারই ঘন হয়। আমরা এক মনে এক কাজে লেগে থাকতে পারি কই?

ঋণ: রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লেখক বিশ্বভারতীতে বাংলার শিক্ষক

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement