সম্পাদকীয় ১

(অতি)নাটকের মতো

নাটক এবং অতিনাটকের সীমারেখাটি সূক্ষ্ম। বাঘা বাঘা নটনটীরাও মাঝেমধ্যেই গণ্ডি অতিক্রম করিয়া ফেলেন। সেই হিসাবে নরেন্দ্র মোদীর প্রতিভা অনস্বীকার্য। কাবুল হইতে দিল্লি ফিরিবার পথে সহসা লাহৌরে অবতরণ এবং নওয়াজ শরিফের ভদ্রাসনে হাজির হইয়া তাঁহাকে শুভ জন্মদিন জ্ঞাপন ও তাঁহার নাতনির বিবাহ উপলক্ষে আনন্দানুষ্ঠানে যোগদান— বলিউডও এতখানি ভাবিয়া উঠিতে পারিত না।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:০৩
Share:

নাটক এবং অতিনাটকের সীমারেখাটি সূক্ষ্ম। বাঘা বাঘা নটনটীরাও মাঝেমধ্যেই গণ্ডি অতিক্রম করিয়া ফেলেন। সেই হিসাবে নরেন্দ্র মোদীর প্রতিভা অনস্বীকার্য। কাবুল হইতে দিল্লি ফিরিবার পথে সহসা লাহৌরে অবতরণ এবং নওয়াজ শরিফের ভদ্রাসনে হাজির হইয়া তাঁহাকে শুভ জন্মদিন জ্ঞাপন ও তাঁহার নাতনির বিবাহ উপলক্ষে আনন্দানুষ্ঠানে যোগদান— বলিউডও এতখানি ভাবিয়া উঠিতে পারিত না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদী অনায়াস পটুতায় এই অলোকসামান্য নাটকীয়তা উদ্‌যাপন করিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন, তিনি সামান্য লোক নহেন। এই পালাটির চিত্রনাট্য কবে কী ভাবে রচিত হইয়াছিল, কে কে ইহার কতখানি জানিতেন, সেই জল্পনা গৌণ। মুখ্য ইহাই যে, দেড় বছর আগে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সহ-নায়কদের সহিত নওয়াজ শরিফকেও আমন্ত্রণ জানাইয়া নরেন্দ্র মোদী যে ‘ব্যক্তিগত’ কূটনীতির নিজস্ব প্রদর্শনী শুরু করিয়াছিলেন, তাহা চলিতেছে, সম্ভবত চলিবেও। রাষ্ট্রনায়কদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা সম্পর্ক বিরল নহে, কিন্তু কূটনৈতিক সম্পর্ক সচরাচর স্বতন্ত্র থাকে। উফা হইতে ব্যাংকক, ব্যাংকক হইতে লাহৌর মোদী-শরিফ জুটি দৃশ্যত সেই স্বাতন্ত্র ভাঙিয়া কূটনীতির লাগাম আপন হাতে লইতে চাহিতেছেন।

Advertisement

এই উদ্যোগকে সম্পূর্ণ অহেতুক বলা চলিবে না। ভারত ও পাকিস্তানের পারস্পরিক সম্পর্ক দাম্পত্য অপেক্ষাও জটিল। এই বহুস্তরীয় এবং বহুমাত্রিক জটিলতার গ্রন্থিগুলি ছেদন করিয়া দ্বন্দ্ব হইতে শান্তির পথে অগ্রসর হওয়া কত কঠিন, দুই যমজ দেশ জন্মাবধি তাহা দেখিয়া আসিতেছে। দুই দেশের কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও তাহাদের চালকরা দীর্ঘ দিন ধরিয়া যে নীতিকাঠামো ও প্রক্রিয়াগুলিকে তৈয়ারি করিয়াছেন তাহা, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র আদি যে কোনও জটিল কাঠামোর মতোই, স্থিতাবস্থার পরম ভক্ত। রাষ্ট্রনায়করা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেই পিছুটান অতিক্রম করিয়া নূতন পথ কাটিতে পারিলে দুই দেশেরই মঙ্গল। উনিশশো আশির দশকে রোনাল্ড রেগন এবং মিখাইল গোর্বাচেভের ব্যক্তিগত সংযোগ ঠান্ডা লড়াইয়ের জগদ্দল পাথর সরাইবার কাজে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা লইয়াছিল। কিন্তু এই দৃষ্টান্তই আবার বুঝাইয়া দেয়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সহায়ক না হইলে ব্যক্তিগত অভিলাষ সফল হয় না। ঠান্ডা লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়াছিল সোভিয়েত কাঠামোর অন্তর্নিহিত সংকটের কারণেই, গোর্বাচেভের নীতি এবং তাঁহার সহিত রেগনের লেনদেন সেই প্রেক্ষিতেই প্রাসঙ্গিক। উপমহাদেশের বাস্তব, বিশেষত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কি নূতন পথে চলিবার অনুকূল?

এই প্রশ্নের উত্তর বহুলাংশে নির্ভরশীল পাক সেনাবাহিনীর উপর। ইসলামাবাদ নহে, রাওয়ালপিন্ডিই সে দেশের প্রকৃত রাজধানী। মোদীর কূটনীতি শরিফকে শান্তিপ্রতিষ্ঠায় দায়বদ্ধ করিতে পারিলেও কাজের কাজ হইবে না, যদি পাক সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ সেই দায়ভাগ স্বীকার না করেন। মোদীর উদ্যোগ অপ্রয়োজনীয় নহে, কিন্তু তাঁহাকে সতর্ক থাকিতে হইবে। ব্যক্তিগত কূটনীতির উপর অতিনির্ভরশীল না হইয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সবল ও সচল রাখা আবশ্যক। সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে চালু হইয়াছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা মুখোমুখি বসিয়াছেন, ভারতের বিদেশ মন্ত্রী ইসলামাবাদ সফর করিয়াছেন, নূতন বছরের শুরুতেই তাঁহার সচিব সফরে যাইবেন। প্রাথমিক বাধা দূর করিবার পরে পাদপ্রদীপের আলো সহযোগীদের উপরে ছাড়িয়া দিয়া কিছুটা পিছনে থাকিলেই প্রধানমন্ত্রী মোদী বুদ্ধিমানের কাজ করিবেন। তাহা না হইলে যে কোনও সময়ে নূতন সংকটের সমস্ত দায় তাঁহার উপর আসিয়া পড়িবে। তখন আবার ফিরিয়া আসিবে ডিগবাজিতন্ত্র। সে বড় সুখের দৃশ্য নহে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement