সম্পাদকীয় ১

আত্মঘাতী

অমিত মিত্র মহাশয়কে দেখিলে শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী মত পাল্টাইতেন। বলিতেন, বড়মানুষরা নহে, মনুষ্যসমাজে কাঁঠাল ফল যদি কেহ থাকেন, তবে তিনি মিত্রমহাশয়। ভাগ্যদেবীর আশীর্বাদে তিনি পাকিয়াছেন, পৃথিবীর রাক্ষস-রাক্ষসীরা ইঁচোড়েই পাড়িয়া দাল্‌না রাঁধিয়া ফেলে নাই। শৃগালেও খায় নাই। কাঁঠাল যেমন বাহিরে কণ্টকাকীর্ণ, কিন্তু ভিতরে তাহার রসালো কোয়া, মিত্রমহাশয়েরও বাহিরে ঋণের বোঝার কাঁটা, কিন্তু অন্তরে তাঁহার খয়রাতির কোয়াগুলি রসে ভরপুর।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০১ জুন ২০১৫ ০০:০১
Share:

অমিত মিত্র মহাশয়কে দেখিলে শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী মত পাল্টাইতেন। বলিতেন, বড়মানুষরা নহে, মনুষ্যসমাজে কাঁঠাল ফল যদি কেহ থাকেন, তবে তিনি মিত্রমহাশয়। ভাগ্যদেবীর আশীর্বাদে তিনি পাকিয়াছেন, পৃথিবীর রাক্ষস-রাক্ষসীরা ইঁচোড়েই পাড়িয়া দাল্‌না রাঁধিয়া ফেলে নাই। শৃগালেও খায় নাই। কাঁঠাল যেমন বাহিরে কণ্টকাকীর্ণ, কিন্তু ভিতরে তাহার রসালো কোয়া, মিত্রমহাশয়েরও বাহিরে ঋণের বোঝার কাঁটা, কিন্তু অন্তরে তাঁহার খয়রাতির কোয়াগুলি রসে ভরপুর। ঠিক যেমন, বাহিরে তিনি বিনিয়োগকারীদের আপনজন, বণিকসভার প্রাক্তন কর্ণধার— কিন্তু ভিতরে মা-মাটি-মানুষের সেনানী। বাহিরের কাঁটা দেখিয়া যে কাঁঠালকে অখাদ্য জ্ঞান করে, কমলাকান্ত বলিতেন, মনুষ্যচরিত্র বুঝিতে তাহার এখনও বিলম্ব আছে। ঠিক জায়গায় ছুরির পোঁচ বসাইতে জানিলে উপরের ঋণে জর্জরিত থাকিবার বাস্তবের আস্তরণ সরিতে সময় লাগে না। রসালো কোয়াগুলিতে তখন মাছি আসিয়া বসে। এ মাছিটি ক্লাব খুলিয়াছে, ছেলেরা সময়ে-অসময়ে মিছিলে আসে, উহাকে এক ফোঁটা রস দাও। ওটি সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি, একটু রস দাও। এটি উৎসব করিতেছে, একটু রস দাও— সেটি পেটের দায়ে দল বদলাইয়া একমনে বঙ্গেশ্বরীর চেয়ার মুছিতেছে, উহাকেও একটু রস দাও। এ মাছিটি কন্যাশ্রী, কিছু রস দাও; সে মাছিটির শপিং মল গড়িবার জন্য প্রদেয় কর দেওয়ার সামর্থ্য নাই, অথচ হাতে টলি-টেলি আছে, তাহাকেও কিছু রস দাও। কাঁঠাল রস দিয়া চলে।

Advertisement

তবে, কণ্টকের কথাও কাঁঠাল ভোলে না। তাহার মালিকও নহেন। সম্প্রতি মিত্রমহাশয় আরও এক বার স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন, তিনি যত টাকা নূতন ধার করিতেছেন, সবই পুরাতন ধার শোধে এবং সুদ প্রদানে খরচ হইয়া যাইতেছে। বলিয়াছেন, কঠিনতর দিন আসিতেছে— পশ্চিমবঙ্গ ঋণের পাহাড়ে চাপা পড়িবে। অস্যার্থ, অর্থমন্ত্রী ঋণের ফাঁদে পড়িয়াছেন। যে মাছিরা গত চার বৎসর কাঁঠালের রসে পুষ্ট হইয়াছে, তাহারাও অবাক হইয়া ভাবিবে, এত রস তবে আসিল কোন পথে? যাঁহার প্রতিটি টাকা তিন বার ভাবিয়া খরচ করিবার কথা, তিনি এমন দানছত্র খুলিলেন কোন সাহসে? বামফ্রন্ট আমলের ঋণ তো আর রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস নহে যে শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছাইবার পূর্বে তাহার পরিমাণ বোঝা যাইবে না। জানিয়া বুঝিয়াই তিনি বীরদর্পে সর্বনাশের পথে হাঁটিয়াছেন? মরিয়া প্রমাণ করিবেন, বামফ্রন্ট সরকারের পাপ ও নরেন্দ্র মোদীর নির্মমতাই তাঁহাদের বাঁচিতে দিল না?

আত্মঘাতী হামলার এই পন্থাটি অভিনব, সন্দেহ নাই, কিন্তু তাহাকে বিচক্ষণ বলা মুশকিল। মিত্রমহাশয়ের নেত্রী গোড়া হইতে একটি রাজনৈতিক লাইন ধরিয়াছেন— যেহেতু তাঁহাকে বামফ্রন্টের পাপের বোঝা বহিতে হইতেছে, অতএব কেন্দ্রীয় সরকার ঋণ মকুব করুন। এই দাবিটি যে এই ভাবে পূরণ হয় না, তাহা তিনিও জানেন। তবুও, ইহা তাঁহার রাজনৈতিক লাইন হইতেই পারে। সত্যই যদি ঋণ মকুব করাইতে পারেন, মন্দ কী? কিন্তু, যাহাকে ‘প্ল্যান বি’ বলে, তাহা কোথায়? কেন্দ্রীয় সরকার হাত উপুড় না করিলে রাজ্য কোন পথে বাঁচিবে? কী ভাবে আর্থিক সংকটের মোকাবিলা করিবে? সরকার কি বিনিয়োগ টানিয়া রাজস্ব বাড়াইবে, কর আদায়ের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করিবে, নাকি এক পয়সাও বাজে খরচ করিবে না? গত চার বৎসরে অমিত মিত্রের নিকট এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর জোটে নাই। যাহা মিলিয়াছে, তাহা আত্মঘাতের নকশা। মহাতীর্থ কালীঘাটের মহিমায় ২০১৬ সালেও যদি তাঁহারা ক্ষমতায় আসেন, তখন কী হইবে? রাজ্যবাসী উত্তর দাবি করিতেছে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement