গুলাম আলির প্রতি শিব সেনার নিষেধাজ্ঞা জারির সংবাদ পাইয়া তসলিমা নাসরিন আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন, ভারত দ্রুত ‘হিন্দু সৌদি’ হইয়া উঠিতেছে কি না। ভারতীয় নাগরিক সমাজের এক বিরাট অংশ গত দুই দিন একই কথা ভাবিয়াছেন, প্রায় একই ভাষায়। এই পরিমাণ অসহনশীলতা যে ভারতের মতো দেশে বাস্তবায়িত হইতে পারে, তাহা অভাবনীয়। মকবুল ফিদা হুসেন বা তসলিমা নাসরিনকে লইয়া এক কালে যাহা হইয়াছে, এই ঘটনা তাহাকেও অতিক্রম করিয়া যায়। এ ক্ষেত্রে শিল্পের অন্তরে কোনও অভিপ্রায় ছিল না, অভিপ্রায়ের প্রস্তাবনাও ছিল না। গুলাম আলি যে শিল্পের চর্চা করেন, তাহা কেবল পূর্ণতার সাধনা, তাহার সামাজিক বা রাজনৈতিক সংযোগ অতি ক্ষীণ। সুতরাং, অন্যান্য শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে যদি বা বিতর্ক জমাইবার অবকাশ থাকে, গজলগায়কের উপর নিষেধাজ্ঞার অজুহাতটুকুও খুঁজিয়া পাওয়া অসম্ভব। সেই কারণেই মুম্বইয়ে শিব সেনাকে সোজা কথাটি সোজা ভাবে বলিতে হইয়াছিল— পাকিস্তানি বলিয়াই তিনি পরিত্যাজ্য। খাস পাকিস্তানেও সচরাচর এত সোজাসাপটা অসহনশীলতার দেখা মিলে না। সুতরাং সৌদির সহিত তুলনাটিই স্বাভাবিক, অপ্রতিরোধ্য। গুলাম আলি নিজে মন্তব্য করিয়াছেন, তিনি দুঃখিত নহেন, বরং আহত। মহান শিল্পীর এই বাক্যের মধ্যে গোটা উপমহাদেশের বাস্তবটি বিধৃত রহিয়াছে। এই মাত্রাছাড়া সভ্যতাবিরোধী সংকীর্ণতা, নির্বোধ পাকিস্তান-বিরোধিতা লইয়া দুঃখ করিবার কারণ নাই। দুঃখের অবকাশ শেষ। ইহা একটি মর্মান্তিক আঘাত। সেই আঘাতের প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ এখনই জরুরি, নতুবা ভারতের আত্মপরিচিতিটি নূতন ভাবে লিখিতে হইবে।
আপাতত রাজনৈতিক নেতারা তাহা বুঝিয়াছেন বলিয়াই মনে হয়। অরবিন্দ কেজরীবাল (ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) পত্রপাঠ জানাইয়াছেন, গুলাম আলি দিল্লিতে (ও কলিকাতায়) স্বাগত। এমনকী নিতিন গডকড়ী ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও তাঁহাদের হিন্দুত্ববাদী বাড়াবাড়ি বিষয়ে সাম্প্রতিক মৌনপর্ব ভাঙিয়া প্রতিবাদ জানাইয়াছেন। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী তথা মহারাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বিজেপি নেতা নিতিন গডকড়ী বলিয়াছেন, তিনি নিজেও গুলাম আলির গান রোজ সকালে শুনেন। ভাগ্যিস। তাঁহার প্রাত্যহিক অভ্যাসটি না থাকিলে ভারতীয় ইতিহাসে এত বড় কলঙ্কের প্রতিবাদ বিজেপি-র অন্দর হইতে আসিত কি না সন্দেহ। উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে উন্মত্ত গোরক্ষিণী সেনার হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি এবং তাঁহার প্রধানমন্ত্রী যখন রাষ্ট্রপতির তাড়া খাইবার আগে মুখ ফুটিয়া একটি প্রতিবাদবাক্যও উচ্চারণ করিতে পারেন নাই, এ বার জাতীয়তারক্ষিণী শিব সেনার বাড়াবাড়ির প্রতিবাদও হয়তো শেষ পর্যন্ত ঘটিয়া উঠিত না।
ইতিহাসের পরিহাস, ভারতীয় সংস্কৃতির উপর প্রবল কুঠারাঘাতটি আসিল মুম্বই হইতে। বহু যুগ ধরিয়া শিল্প-সংস্কৃতি হইতে বাণিজ্য-অর্থনীতি, সর্ব ক্ষেত্রেই ভারতের মুক্তির প্রধানতম ‘গেটওয়ে’টি ছিল মুম্বই। এ কালেও শাহরুখ খান, সলমন খানরা এ দেশের জনপ্রিয়তম ‘রাষ্ট্রদূত’, পাকিস্তান-সহ নানা দেশে ভারতের পরমাদৃত মুখ। পাকিস্তানি সুফি গায়ক নুসরত ফতে আলি খানের সর্বাধিক কদর ছিল এই শহরেই। প্রসঙ্গত, মুম্বইয়ে গুলাম আলি এ বারের অনুষ্ঠানটি প্রয়াত গজল-গায়ক জগজিৎ সিংহের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধানিবেদনের উদ্দেেশ্যই পরিকল্পিত ছিল। রাষ্ট্রীয় সীমান্তরেখা ডিঙাইয়া এই গভীর শ্রদ্ধা ও প্রীতির সম্পর্কটি স্থাপনের মঞ্চ মুম্বই নিজেই বহু দশকের যত্নে প্রস্তুত করিয়াছিল। এই সমন্বয় সংস্কৃতিই তাহার সম্মানিত চরিত্রলক্ষণ। ‘সৈনিক’ উদ্যোগ সেই পরিচিতিটিকে ধ্বস্ত করিতেছে। ইহার প্রতিরোধের পথ মুম্বইকেই খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে।