সম্পাদকীয় ১

গোড়ার দর্শন

গুজরাতে ইশরাত জাহান কাণ্ড হইতে ভোপালে কেন্দ্রীয় জেল-পলাতক আট বন্দির নিধন-কাণ্ড— একই প্রশ্ন, একই অনুত্তর। আরও এক বার উপলব্ধি: রাষ্ট্রতন্ত্রের সহিত গণতন্ত্রের অন্তর্লীন যে বিরোধ, তাহার একটি পরিণাম রাষ্ট্রের নকল ‘এনকাউন্টার কিলিং’।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০১৬ ০০:০০
Share:

গুজরাতে ইশরাত জাহান কাণ্ড হইতে ভোপালে কেন্দ্রীয় জেল-পলাতক আট বন্দির নিধন-কাণ্ড— একই প্রশ্ন, একই অনুত্তর। আরও এক বার উপলব্ধি: রাষ্ট্রতন্ত্রের সহিত গণতন্ত্রের অন্তর্লীন যে বিরোধ, তাহার একটি পরিণাম রাষ্ট্রের নকল ‘এনকাউন্টার কিলিং’, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে যে পদ্ধতির বহুলব্যবহারের অভিযোগ প্রবল। সংকটটি পরিচিত। রাষ্ট্র যাহাকে বিপজ্জনক বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছে, তাহাকে মারিতে চাহে। এ দিকে গণতন্ত্র-মতে, বিপজ্জনক অপরাধীরও ব্যক্তি-অধিকার অনতিক্রম্য। সেই দায়িত্ব এড়াইতে রাষ্ট্র নানা প্রকার পন্থা অবলম্বন করে, গণতন্ত্র-মতে যাহা কুপন্থা। যথা, নকল এনকাউন্টার কিলিং। নিষিদ্ধ ইসলামি সংগঠনের সদস্য আট জন বন্দি সত্যই ভোপালের কেন্দ্রীয় জেল হইতে পলাইতেছিলেন কি না, পলায়নের সময় তাহাদের সহিত অস্ত্র ছিল কি না, পুলিশ তাহাদের না মারিলে কোনও বড় বিপদের আশঙ্কা ছিল কি না, না মারিয়া তাহাদের অন্য কোনও ভাবে ধরা সম্ভব ছিল কি না, ইত্যাদি কূট প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনও অপ্রকাশ। পুলিশ ও সরকার যেখানে একমাত্র সাক্ষী, সেখানে পুলিশ ও সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো কঠিন কাজ আর কী-ই বা হইতে পারে। মধ্যপ্রদেশ সরকার তদন্তের আশ্বাস দিয়াছে। আশঙ্কা প্রবল যে, রুটিনমাফিক তদন্তের পর রুটিনমাফিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যাইবে। তবে ইতিমধ্যেই যে সমস্ত পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলিয়াছে, ঘটনাস্থলের স্থানীয় মানুষ হইতে শুরু করিয়া পুলিশ অফিসার অবধি যে সব কথা বলিয়াছেন, তাহাতে সংশয়ের পাল্লাটি ত্রুত ভারী হইতেছে।

Advertisement

ব্রিটিশ আমল হইতে এই মানবাধিকার-বিরোধী কুনাট্য চলিয়া আসিতেছে। স্বাধীনতার পর ভারতীয় রাষ্ট্র মহোৎসাহে তাহা আত্মস্থ করিয়াছে। এই ত্বরিত নকলনবিশির কারণটি স্পষ্ট: রাষ্ট্রশক্তিকে সকলের উপরে স্থান দিতে হইবে এই নীতিতে ভারতীয় রাষ্ট্র সাক্ষাৎ নিবেদিত। প্রশ্ন হইল, এই নিবেদন কি যুক্তিসংগত? গণতন্ত্রের সহিত রাষ্ট্রতন্ত্রের বিরোধিতায় কি এই শর্ত না মানিয়া উপায় নাই যে, রাষ্ট্রশক্তিই শেষ পর্যন্ত সর্বমান্য? রাষ্ট্রের অধিকারই নাগরিকের অধিকারের উপরে বিরাজমান? সন্দেহ নাই, এই শর্ত কিন্তু অত্যন্ত আত্মপরাভবী। এক বার ইহা মানিয়া লইলে গণতন্ত্রের গ অক্ষরটিই পরাভূত হয়, পড়িয়া থাকে কেবল উত্তুঙ্গ তন্ত্রটি। আধুনিক লিবারেল রাষ্ট্রের প্রবক্তারা এই জন্যই রাষ্ট্রক্ষমতার উপর কিছু নিয়ন্ত্রণ বাঁধিয়া দিতে চাহিয়াছিলেন, যাহা দিয়া ক্ষমতার যদৃচ্ছ ব্যবহার ঠেকানো সম্ভব। সেই নিয়ন্ত্রণেরই অন্যতম, সংবিধানসম্মত নাগরিক অধিকার। উপযুক্ত তদন্ত ও বিচার ছাড়া রাষ্ট্র কর্তৃক কোনও নাগরিকের প্রাণ লইবার অনধিকার।

মৌলিক আদর্শটি এই ভাবে বিঘ্নিত হইতেছে বলিয়াই ভারতীয় রাষ্ট্র তথা তাহার শাসনবিভাগের এনকাউন্টার-প্রীতি দেশের বিচারবিভাগকে উদ্বিগ্ন রাখিয়াছে। গত জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্পষ্ট ভাষায় বলা হইয়াছে, গূঢ় কিংবা গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও পুলিশ, সরকার, এমনকী দেশের সেনাবাহিনীও বিনা প্রশ্নে, বিনা বিচারে কোনও নাগরিককে হত্যা করিতে পারে না। ইহাও বলা হইয়াছে যে এমন ঘটনা ঘটিয়া গেলে সিআইডি তদন্ত অবশ্যকর্তব্য। আদালতের নির্দেশের আগে মণিপুর, কাশ্মীর, পঞ্জাব ও অসমে এই নীতির ব্যাপক লঙ্ঘন ঘটিয়াছে। মধ্যপ্রদেশেও। চম্বল দস্যুদলের নির্বিচার হত্যা প্রশ্নাতীত ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা আসিবার পর আবারও ভোপালের আট বন্দির নিধন ওই রাজ্যের সঙ্গে সঙ্গে গোটা দেশকে মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাইয়া দিল।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement