টেরেসা মে দিল্লির মাটিতে পা দিতেছেন পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ লইয়া। আদালত হইতে তাঁহার সাধের ব্রেক্সিটের উপর ব্রেক কষিবার নির্দেশ আসিয়াছে। এই নির্দেশে ব্রেক্সিট একেবারে পরাস্ত হইল এতখানি বলা যাইবে না। বরং বলা যায়, ব্রেক্সিটের সম্ভাবনায় একটি প্রশ্নচিহ্ন বসিল। তাহার দৃঢ় রূপের তুলায় নমনীয় রূপটি বাছিয়া লইবার সুযোগ বাড়িল। তবে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে কিন্তু নিঃসন্দেহে একটি নৈতিক পরাজয়ের মুখোমুখি হইলেন। ভুলিলে চলিবে না, ব্রেক্সিট-পন্থী টেরেসা মে যে প্রাক্তন ব্রেক্সিট-বিরোধী প্রধানমন্ত্রীর স্থান লইতে সমর্থ হইয়াছেন, তাহা ব্রেক্সিট গণভোটের রায়ের উপর সওয়ার হইয়াই। ক্ষমতাসীন হইয়া ইস্তক প্রধানমন্ত্রী মে-র অন্যতম প্রধান পরিচয় তাঁহার মনোহারীতম স্লোগান: ‘ব্রেক্সিট মানে ব্রেক্সিট’। অর্থাৎ গণভোটের রায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিপক্ষে যাইবার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রায় একটি ব্যক্তিগত লড়াই লড়িতেছেন, সত্বর ব্রেক্সিট সম্ভাবিত করিবার লক্ষ্যে। তাঁহার সেই মনোবাঞ্ছায় রাশ টানিলেন তিন বরিষ্ঠ বিচারপতি। তাঁহাদের মতে, পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া ব্রেক্সিট-এর রূপায়ণ হইবে না। চিরাচরিত রীতিতে পার্লামেন্টের দুই কক্ষে পাশ হইলে তবেই গণভোটের রায় মান্য হইবে
কেবল ব্রেক্সিটের জন্য নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রের রূপ ও প্রকৃতি বিষয়েও এই রায়ের প্রাসঙ্গিকতা সুদূরপ্রসারী। গণভোটের মাধ্যমে কী ও কত দূর করা সঙ্গত, জনতার প্রত্যক্ষ মতের কোনও সীমা থাকা উচিত কি না, এই সব প্রশ্ন গণতন্ত্রের কেতাবি তত্ত্বের গহন হইতে ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়া বসিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বলিয়াছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাই না। তবে কেন তাঁহাদের কথার উপর আবার নূতন করিয়া সীমা আরোপ করা? কেন জনতা অপেক্ষা জনপ্রতিনিধিদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া? কারণ ব্রিটিশ আদালত মনে করিতেছে, প্রতিনিধিরা যখন নির্বাচিত হইয়াই আইনসভায় আসিয়াছেন, এবং জনসাধারণের স্বাধীন ভোটাধিকারই তাঁহাদের আনিয়াছে, তখন তাঁহাদের মতামতের গুরুত্ব অতিক্রম করিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে দেশের উপর চাপাইয়া দেওয়ার মধ্যে একটি আদর্শগত বিরোধ আছে। তাহা ভিন্ন, গণতন্ত্র মানেই সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রত্যক্ষ মত কি না, সে প্রশ্নও উঠে বইকী। গরিষ্ঠ মতের দ্বারা সমাজের বিপথচালিত হইবার দৃষ্টান্ত তো ইতিহাসে কম নাই। অন্তত উনিশশো ত্রিশের দশকের জার্মানিকে ইউরোপের কোনও গণতন্ত্রই ভুলিবে না। গণতন্ত্রের তাত্ত্বিকরা এই তন্ত্রের কাঁচা ব্যবহারের বিষয়ে বারংবার সতর্ক করিয়া গিয়াছেন। ব্রিটিশ বিচারপতিরা তাই বলিতেছেন: প্রতিনিধিত্ব একটি ছাঁকনি-স্বরূপ। বিপদ অন্তত কিছু্টা ছাঁকিবার জন্য তাহার ব্যবহার বাঞ্ছিত।
আইনসভার প্রতিনিধিরা আইন পাশের মাধ্যমে ব্রেক্সিট পাশ করাইলে তবেই তাহা প্রযোজ্য: আপাতত সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ শাসনবিভাগ হইতে বিষয়টি এ বার ব্রিটিশ আইনবিভাগের আওতায় আসিল। ইহার অর্থ— শাসক পক্ষের জোর অনেকাংশে কমিল। এখানেও গণতন্ত্রের প্রক্রিয়াগত সংশোধন লক্ষণীয়। শাসনবিভাগের নিয়ন্ত্রণ যেহেতু সরকার পক্ষের হাতে, আর আইনবিভাগে সরকার ও বিরোধী, সব প্রতিনিধিদের কণ্ঠের জোর সমান, কেন টেরিজা মে এই রায়ে পরাজিত বোধ করিতেছেন, বুঝিতে কষ্ট হয় না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই যে যুদ্ধজয় নহে, তাহার প্রয়োগ ও পদ্ধতি যে কতখানি সচেতন সতর্কতা দাবি করে, ব্রেক্সিট-বিতর্কের নূতন বাঁকে তাহার সাক্ষাৎ প্রমাণ।