চোখে দেখা যায় না।’ বলিয়াছেন শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়ের মা। না, শৌভিক ও তাঁহার পিতা কমলবাবু প্রেসিডেন্সি কলেজের এক ছাত্রীকে রানিকুঠিতে যে ভাবে হেনস্থা করিয়াছেন, তাঁহার মায়ের চোখে সেই দৃশ্যটি অসহ্য ঠেকে নাই। এক স্নাতক স্তরের ছাত্রীর সম্মানহানি তাঁহাকে বিচলিত করে নাই। পুরুষের হাতে এক নারীর লাঞ্ছনাকে তিনি বিন্দুমাত্র অস্বাভাবিক জ্ঞান করেন নাই। তাঁহাকে পীড়া দিয়াছে মেয়েটির ধূমপান করিবার দৃশ্য। শৌভিকও যেমন জানাইয়াছেন, ‘তাঁহাদের এলাকা’য় এমন আচরণ কিছুতেই চলিতে পারে না। কোন দৃশ্যটি চোখে দেখা যায়, আর কোনটি যায় না, তাহা স্থির করিয়া দেয় চোখের পিছনে থাকা মন। পুরুষতন্ত্রের শিকড়ে বাঁধা তাঁহাদের মন একটি মেয়ের প্রকাশ্যে ধূমপানের স্পর্ধা দেখিয়া যারপরনাই বিচলিত হইয়াছিল। যেহেতু তাঁহাদের পিছনে ঘাসফুল আঁকা পতাকা আছে, অতএব নৈতিক জ্যাঠামহাশয় হইতে তাঁহারা আর দ্বিতীয় বার ভাবেন নাই।
অশীলিত মনের সহিত অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার মিশেল সর্বদাই বিপজ্জনক— তাহাই খাপ পঞ্চায়েতের মূল উপকরণ। রাতের রানিকুঠি সেই বিপদের সাক্ষী থাকিয়াছে। শাসকের ক্ষমতাকে সবাই ডরায়। ফলে, কেহ তাঁহাদের বলিয়া দেয় নাই, চোখে দেখা না গেলে চোখ বন্ধ করিয়া রাখাই বিধেয়। দোষ দৃশ্যটির নহে, দোষ তাঁহাদের চোখের। দোষ তাঁহাদের মনের। তাঁহাদের মনটি সভ্য সমাজের উপযুক্ত নহে। মনটি শুধু আগ্রাসী পুরুষতান্ত্রিক বলিয়া নহে, তাহা নিজের সীমায় থাকিতে জানে না বলিয়া। কোনও ঘটনাকে, কোনও মানুষকে, কোনও চিন্তাকে অপছন্দ করিবার অধিকার প্রত্যেকের আছে। রানিকুঠির বীরপুঙ্গবদেরও আছে। কিন্তু, সেই অপছন্দটি জাহির করিবার জন্য অপছন্দের মানুষের চড়াও হওয়ার, অথবা অপছন্দের ঘটনাটিকে গায়ের জোরে বন্ধ করিয়া দেওয়ার অধিকার কাহারও নাই। অপছন্দের বিষয়টির বিরুদ্ধে তাঁহারা জনমত গড়িয়া তুলুন, আদালতের দ্বারস্থ হউন। প্রয়োজনে আইন বদলাইবার দাবি তুলুন। কিন্তু, সভ্য সমাজে কোনও অবস্থাতেই গা-জোয়ারি চলিতে পারে না। এমনকী, ‘নিজেদের এলাকা’-তেও নহে। শৌভিক যাহাই দাবি করুন, বসতবাড়ির ন্যায় যে সম্পত্তি আইনত তাঁহাদের, তাহার বাহিরে কোনও এলাকাই তাঁহার, অথবা তাঁহার পিতৃদেবের, ‘নিজস্ব’ নহে।
অবশ্য, যাহা ‘চোখে দেখা যায় না’, ‘নিজের এলাকা’য় তাহা চলিতে না দেওয়ার মনোভাবটি তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে জন্মায় নাই। আর পাঁচটি কু-অভ্যাসের ন্যায় এই জ্যাঠামহাশয়পনার অভ্যাসও তাহারা বামফ্রন্টের উত্তরাধিকারসূত্রে পাইয়াছে। লোকাল কমিটির খুচরা ঔদ্ধত্যের কথা না হয় বাদই থাকুক, যতীন চক্রবর্তী বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরাও কম যাইতেন না। যতীন চক্রবর্তী যখন সরকারি মঞ্চে উষা উত্থুপের গান বন্ধ করিবার ফরমান জারি করিয়াছিলেন, তখন তিনি— তাঁহারই বয়ান অনুযায়ী— সস্তা, বিকৃত, ডিস্কো রুচি হইতে রাজ্যকে রক্ষা করিতেছিলেন। অর্থাৎ, নিজের এলাকায় জ্যাঠামহাশয় সাজিয়াছিলেন। বুদ্ধদেববাবু যখন ‘বারবধূ’ নাটকের অভিনয় বন্ধ করিতে পরিচালক অসীম চক্রবর্তীকে চিঠি লিখিয়াছিলেন, তখন কি তিনিও জাতির নৈতিক অভিভাবকের দায়িত্বই লন নাই? জ্যোতি বসু ‘হোপ ৮৬’-তে শ্রীদেবীর নাচ দেখায় দলের মধ্যেই ঢি ঢি পড়িয়া গিয়াছিল। শৌভিকরা উঁচু দরের পাঠশালারই ছাত্র, সন্দেহ নাই।