সম্পাদকীয় ১

জবরদস্তি

কখনও কখনও এমন সমাধান ভাবিয়া বাহির করা হয়, যাহা সমস্যার অধিক ভয়ংকর। সুপ্রিম কোর্ট শিশু-পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কেন্দ্রকে ব্যবস্থা লইবার আদেশ দিয়াছিলেন, এই কর্মে তাহার গড়িমসিকে তিরস্কারও করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহা করিতে গিয়া ভারতীয় সরকার এই বার ইন্টারনেটে ৮০০-র অধিক পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধ করিয়া দিল। সুপ্রিম কোর্ট ইহার পূর্বে এই প্রশ্নেই প্রাপ্তবয়স্কদের সকল সাইট নিষিদ্ধ করিতে অস্বীকার করিয়াছিলেন, কারণ তাহা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করিবে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৫ অগস্ট ২০১৫ ০০:০৩
Share:

কখনও কখনও এমন সমাধান ভাবিয়া বাহির করা হয়, যাহা সমস্যার অধিক ভয়ংকর। সুপ্রিম কোর্ট শিশু-পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কেন্দ্রকে ব্যবস্থা লইবার আদেশ দিয়াছিলেন, এই কর্মে তাহার গড়িমসিকে তিরস্কারও করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহা করিতে গিয়া ভারতীয় সরকার এই বার ইন্টারনেটে ৮০০-র অধিক পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধ করিয়া দিল। সুপ্রিম কোর্ট ইহার পূর্বে এই প্রশ্নেই প্রাপ্তবয়স্কদের সকল সাইট নিষিদ্ধ করিতে অস্বীকার করিয়াছিলেন, কারণ তাহা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করিবে। যৌন সাইট মাত্রেই অনৈতিক বলিয়া সরকারও কোনও মতামত দেয় নাই। তাহা হইলে অকস্মাৎ একটি বিশেষ প্রকারের আপত্তিকর পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধ করিতে গিয়া, পাইকারি হারে সকল পর্নোগ্রাফির প্রতিই আক্রমণ শানাইলে— দুর্নীতি রুখিতে গিয়া স্বাধীনতা হরণের চরম গলদ হইয়া যায়। এক জন ব্যক্তি তাঁহার কম্পিউটারে বা মোবাইল ফোনে কী দেখিবেন, তাহা পুরাপুরি ঠিক করিয়া দিবার অধিকার সরকারের আছে কি না, পর্নোগ্রাফি মাত্রেই এই দেশের ও সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর কি না, তাহা লইয়া আলোচনা ও বিতর্ক চলুক, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিকগণের মতামত লওয়া হউক। কিন্তু তাহার কোনও সূত্রপাত না করিয়াই, এক সুন্দর সকালে পর্নোগ্রাফি ব্যাপারটিই দেশময় নিষিদ্ধ করিয়া দিলে, তাহা নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকিয়া পড়িয়া তালা ঝুলাইয়া দিবার জুলুমবাজি ব্যতীত আর কিছুই নহে। এই ফতোয়াধর্মিতার মধ্যে মুক্তমনস্কতার প্রতি একটি শত্রুতার আভাস রহিয়াছে।

Advertisement

ভারতীয় সমাজে নীতি-পুলিশের অভাব নাই। বহু সংগঠনের কাজই হইল ঠিক করিয়া দেওয়া, পার্কে প্রেমিক-প্রেমিকা কী ভাবে বসিবেন, বা পাড়ার অমুক যুগল বিবাহ না করিয়াও একত্রে বাস করিতে পারিবেন কি না। ভ্যালেন্টাইন’স ডে উপলক্ষে বহু সংগঠন ঘনিষ্ঠ যুগলকে কান ধরিয়া ওঠবোস করাইবার পবিত্র দায়িত্ব পালন করিয়া থাকে। রাষ্ট্র যদি ইহাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী কর্মসূচি গ্রহণ করে, তাহা দুর্ভাগ্যজনক। অবশ্য এই দেশে বাক্‌স্বাধীনতা ও সম্পৃক্ত অন্যান্য স্বাধীনতা বিষয়ে সহনশীলতা অত্যন্ত কম। চলচ্চিত্র বা সাহিত্য লইয়া প্রায়ই এই মর্মে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সেন্সরব্যবস্থা কোনও একটি ছবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়া দেয় বা লেখকের একটি গ্রন্থ লইয়া এমন প্রতিবাদ উত্থিত হয়, রাষ্ট্র লেখকের স্বাধীনতার পরিবর্তে পথের গোলমালকে অগ্রাধিকার দিয়া যানবাহনের স্বাধীনতার ব্যবস্থা করিতে ব্যস্ত হইয়া পড়ে। নাগরিককে শ্রদ্ধা না করিয়া, তাহাকে অধীনস্থ প্রজা ভাবিলে, এই রূপ মানসিকতা জন্মাইবার সম্ভাবনা প্রবল। এক ব্যক্তি যত ক্ষণ অন্য কাহারও ক্ষতি না করিতেছে, তত ক্ষণ সে তাহার ব্যক্তিগত জীবনে কোন উদ্ভট শখকে প্রশ্রয় দিতেছে বা প্রথাবিরুদ্ধ কর্ম করিতেছে, তাহা লইয়া প্রশ্ন তুলিবার অধিকার কাহারও নাই। কিন্তু অনুদার মানসিকতা বলিবে, নাগরিকের প্রতিটি মুহূর্তই রাষ্ট্রের প্রতি বলিপ্রদত্ত। বহু দেশ এই মনোবৃত্তি লইয়া চলিয়াছে ও চলিতেছে, কোথাও নারীদের গাড়ি চালাইবার অধিকার বাজেয়াপ্ত করা হইতেছে, কোথাও ঈশ্বরোপাসনার অধিকার খর্ব করা হইয়াছিল। তবে সেই দেশগুলি গণতান্ত্রিক বলিয়া নিজেদের পরিচয় দেয় না। গণতন্ত্রে এই জবরদস্তির স্থান নাই। আর, গণতন্ত্র একটি অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমান বন্দোবস্ত বলিয়া, তাহার ইহাও বুঝিবার ক্ষমতা আছে: নিষিদ্ধ করিলে পর্নোগ্রাফির প্রতি সাধারণ মানুষের যে উৎসাহ ও আকর্ষণ জন্ম লইবে, তাহা অ-নিষিদ্ধ অবস্থার বহু গুণ। ভারত সহসা যদি বুদ্ধি বিচক্ষণতা ও ব্যক্তিশ্রদ্ধা হারায়, তবে দেশের নীতি-কলেবর ধৌত করিবার অতিসক্রিয়তায়, স্বাধীনতার অমূল্য সত্তাটিকে মুছিয়া ফেলিবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement