সম্পাদকীয় ১

জলের বদলে

একটি ঐতিহাসিক ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হইল। নরেন্দ্র মোদী যে কৃতিত্বের অধিকারী হইলেন, তাহা মনমোহন সিংহের হইতে পারিত, যদি না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঁকিয়া বসিতেন। হয়তো চার বৎসর পূর্বেই বাংলাদেশের সহিত স্থলসীমান্ত হস্তান্তর চুক্তি রূপায়িত হইত। সেই না-হওয়ার পিছনে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনমনীয়তার দায় ছিল, তেমনই কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে রাজ্যের সম্মতি আদায়ে ব্যর্থতাও ছিল। নরেন্দ্র মোদীর মূল কৃতিত্ব, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পার্শ্বে রাখিয়াছেন।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১০ জুন ২০১৫ ০০:১২
Share:

একটি ঐতিহাসিক ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হইল। নরেন্দ্র মোদী যে কৃতিত্বের অধিকারী হইলেন, তাহা মনমোহন সিংহের হইতে পারিত, যদি না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঁকিয়া বসিতেন। হয়তো চার বৎসর পূর্বেই বাংলাদেশের সহিত স্থলসীমান্ত হস্তান্তর চুক্তি রূপায়িত হইত। সেই না-হওয়ার পিছনে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনমনীয়তার দায় ছিল, তেমনই কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে রাজ্যের সম্মতি আদায়ে ব্যর্থতাও ছিল। নরেন্দ্র মোদীর মূল কৃতিত্ব, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পার্শ্বে রাখিয়াছেন। আন্তর্জাতিক প্রশ্নে কোনও প্রাদেশিক সরকারের মতামতকে গুরুত্ব না দিলেও চলে, কিন্তু তাহা দেশের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর। ঢাকায় চুক্তিতে স্বাক্ষর করিবার সময় নরেন্দ্র মোদীর পার্শ্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি, অতএব, প্রতীকী। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়তো ভবিষ্যতে তিস্তা বিষয়েও বাংলাদেশের সহিত চুক্তিতে সম্মত হইবেন। বাংলাদেশের সহিত সুসম্পর্কের প্রশ্নে এই চুক্তির গুরুত্ব অসামান্য। ভূ-রাজনৈতিক ভাবে বাংলাদেশ ভারতের নিকট অতি তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষত সন্ত্রাসের প্রশ্নে শেখ হাসিনার শাসনকালে বাংলাদেশ যে ভাবে ভারতের সহিত সহযোগিতা করিয়াছে, তাহাতে বাংলাদেশের এই দীর্ঘকালীন দাবিটি পূরণ করা ভারতের কর্তব্য। নদীপ্রবাহের নীচের দিকে যে দেশের অবস্থান, তাহার স্বার্থ রক্ষা করার নীতিটি আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃতও বটে। ভারতের নিজের স্বার্থেই তিস্তা সমস্যার মীমাংসা প্রয়োজন।

Advertisement

কিন্তু, একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ ষোলো আনা রক্ষা কার্যত অসম্ভব। শুখা মরসুমে নদীতে যতটুকু জল থাকে, তাহাতে একই সঙ্গে দুই দেশের সেচের দাবি পূরণ করা চলে না। অতএব, একটি পক্ষকে এক আনা বেশি দিতে চাহিলে অন্য পক্ষকে এক আনা ছাড়িতে হইবে। নিছক রাজনৈতিক কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতি মানিয়া লওয়া কঠিন। তাঁহার হাতে দুইটি বিকল্প আছে। এক, তিনি এত দিন যেমন অনড় হইয়া আছেন, তেমনই থাকিতে পারেন; দুই, তিনি কেন্দ্রের নিকট ক্ষতিপূরণ দাবি করিতে পারেন। প্রথম অবস্থানটি সহজতর, কিন্তু ফলহীন। তাঁহার কর্তব্য, নরেন্দ্র মোদীর নিকট পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রকল্প দাবি করা। যেহেতু তিস্তা চুক্তি ভারতের জাতীয় স্বার্থেই জরুরি, অতএব কেন্দ্রীয় সরকার হয়তো তাহার দাম চুকাইতে অরাজি হইবে না। সেই ক্ষতিপূরণের চরিত্র কী হইবে, তাহা আলোচনাসাপেক্ষ। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী স্মরণে রাখিতে পারেন, তিস্তা চুক্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত হইবে উত্তরবঙ্গ। এমনিতেও উত্তরবঙ্গ চির-অবহেলিত। সুতরাং, সেই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য দাবি পেশ করিতে পারেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বুঝিতে হইবে, পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে তিস্তা চুক্তিতে বাংলাদেশ নিমিত্তমাত্র। এই চুক্তি রাজ্যের নিকট কেন্দ্রের সহিত দর-কষাকষির প্রশ্ন। ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে চুক্তিটি অপরিহার্য। তাহাকে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে কতখানি লাভজনক করিয়া তোলা যায়, তাহাই মুখ্যমন্ত্রীর বিবেচ্য হওয়া বিধেয়। সেই দর-কষাকষির ময়দানে অবস্থানের নমনীয়তা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি চুক্তির বিরুদ্ধে অনড় থাকিলে পশ্চিমবঙ্গের লাভ নাই, বিনা প্রশ্নে কেন্দ্রের দাবি মানিয়া লওয়াও অবিবেচনার কাজ হইবে। তিনি জমি ছাড়িবেন, কিন্তু তাহার প্রত্যেক ইঞ্চির দাম বুঝিয়া লইবেন। মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই সেই পথে এক কদম হাঁটিয়াছেন। সচিবস্তরে আলোচনায় সম্মতি জানাইয়াছেন, চুক্তির শর্তাবলি পুনর্বিবেচনার কাজ আরম্ভ করিয়াছেন। প্রতিটি পদক্ষেপে সাবধান থাকিতে হইবে। রাজ্যের জন্য তিনি কতখানি লড়িতে পারেন, তাহাই মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁহার সাফল্যের একটি বড় মাপকাঠি।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement