সম্পাদকীয় ১

নাটক মঞ্চে সুন্দর

উ দ্ভটনাট্য বলিবার উপায় নাই, কারণ গ্রিসে যাহা ঘটিতেছে তাহা কঠোর বাস্তব। কিন্তু সেই বাস্তব দেখিলে সে দেশের আদি নাট্যকাররাও শিহরিত হইতেন। অঙ্কের পর অঙ্ক, একটি ক্লাইম্যাক্সের পালা চুকিবার আগেই পরবর্তী ক্লাইম্যাক্স— অবশিষ্ট ইউরোপ তথা বিশ্ব এই প্রাচীন, ক্ষুদ্র এবং বিপর্যস্ত দেশটিকে বলিতেই পারেন: তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের শেষ নাই।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৮ জুলাই ২০১৫ ০০:০৩
Share:

উ দ্ভটনাট্য বলিবার উপায় নাই, কারণ গ্রিসে যাহা ঘটিতেছে তাহা কঠোর বাস্তব। কিন্তু সেই বাস্তব দেখিলে সে দেশের আদি নাট্যকাররাও শিহরিত হইতেন। অঙ্কের পর অঙ্ক, একটি ক্লাইম্যাক্সের পালা চুকিবার আগেই পরবর্তী ক্লাইম্যাক্স— অবশিষ্ট ইউরোপ তথা বিশ্ব এই প্রাচীন, ক্ষুদ্র এবং বিপর্যস্ত দেশটিকে বলিতেই পারেন: তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের শেষ নাই। পাওনাদারদের প্রস্তাবিত আর্থিক সংস্কার তথা কৃচ্ছ্রসাধনের যে দাবি সম্পর্কে জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাস গণভোট ডাকিলেন, ‘না’ ভোট দানের জন্য প্রচার করিলেন এবং অপ্রত্যাশিত মাত্রায় জয়ী হইলেন, প্রায় চোখের পলকে কার্যত সেই দাবিগুলিই মানিয়া লইয়া তিনি আইনসভায় সমর্থন চাহিলেন এবং, পশ্য পশ্য, জয়ী হইলেন। সাত দিনের মধ্যে উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু জয় করিবার এই কৃতিকে শ্বাসরোধকর বলিলে অত্যুক্তি হয় না।

Advertisement

এই অবিশ্বাস্য স্ববিরোধ সম্পর্কে সিপ্রাস নিজেও সচেতন। তিনি ঘোষণা করিয়াছেন: নূতন আর্থিক সাহায্য মঞ্জুর করিবার যে শর্তগুলি জার্মানি তথা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ধার্য করিয়াছে, তাহা তিনি সমর্থন করেন না, কিন্তু ইহা না মানিলে সাহায্য মিলিবে না, সাহায্য না মিলিলে সংকট অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছাইবে। তাঁহার নূতন অর্থমন্ত্রী ইউক্লিদ সাকালোতোসও পার্লামেন্টে কবুল করিয়াছেন, নূতন চুক্তিটি কঠিন, এই পথে সমস্যার কতটা সুরাহা হইবে, তাহা ভবিষ্যত্‌ই বলিতে পারে। মর্মার্থ সহজ এবং সরল: গ্রিসের পক্ষে ইইউয়ের হাত ছাড়িয়া একলা চলা কঠিন, সুতরাং শেষ পর্যন্ত কৃচ্ছ্রসাধনের তিক্ত বটিকা সেবন করিতে হইতেছে। এই কঠোর সংস্কার নীতির বিরোধিতা করিয়াই বছরের গোড়ায় সিপ্রাসের বামপন্থী সিরিজা দল ভোটে জিতিয়া ক্ষমতায় আসিয়াছিল। ছয় মাসের মধ্যে লাল রং ফিকা হইয়া আসিয়াছে। সিরিজার যে নেতারা আপন পাকা রংটি ছাড়িতে নারাজ, তাঁহারা পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়াছেন, হয়তো ক্রমে দলও ছাড়িবেন। তাঁহাদের অগ্নিবর্ষী নায়ক, বাইক-আরোহী ভূতপূর্ব অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভরুফাকিস নূতন শর্তাবলিকে ভার্সাই চুক্তির সহিত তুলনা করিয়াছেন। নাটকীয় তুলনা, সন্দেহ নাই।

নাটক মঞ্চে সুন্দর, অর্থনীতি বাস্তবে। সিপ্রাস যদি বামপন্থী খোয়াব ছাড়িয়া সংস্কারে আসেন এবং থাকিতে পারেন, তবে হয়তো দেশটি বাঁচিবার পথে ফিরিতে পারে। সেই পথ দীর্ঘ এবং দুর্গম। যথেষ্ট কাজ না করিয়া, প্রয়োজনীয় রাজস্ব না দিয়া এবং সামর্থ্যের অতিরিক্ত ব্যয় করিয়া গ্রিসের মানুষ যে অ-সম্ভবের দেশ তৈয়ারি করিয়াছেন, তাহাকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো অত্যন্ত কঠিন কাজ। আইএমএফ ভুল বলে নাই, সেই কাজে ইইউয়ের সহযোগিতা আবশ্যক। শেষ অবধি সেই সহযোগিতা হয়তো মিলিবে, ফ্রান্সের সংসদ ইতিমধ্যেই নূতন সহযোগিতার প্রস্তাব সমর্থন করিয়াছে, জার্মানির পক্ষেও ‘না’ বলিয়া দেওয়া কঠিন। কিন্তু তাহা বাহিরের সাহায্যমাত্র, আসল কাজটি গ্রিসের নিজের। তাহার নাম কৃচ্ছ্রসাধন। সেই কাজ জনপ্রিয় হইতে পারে না। কিন্তু যে দেশের জাতীয় ঋণ তাহার জাতীয় আয়ের দেড়গুণের বেশি এবং আইএমএফের হিসাব মাফিক অচিরেই দ্বিগুণ হইবে, তাহার জনসাধারণকে অপ্রিয় ঔষধ সেবন করিতে হইবে। অন্য পথ নাই। কিংবা আছে। সর্বনাশের পথ। গ্রিসের মানুষ হয়তো তাহা বুঝিয়াছেন, সেই কারণেই গণভোটে বৈপ্লবিক ‘না’-এর জয় হইলেও পার্লামেন্টে ভোটের আগে অন্তত একটি জনমত সমীক্ষায় সত্তর শতাংশ মানুষ বলিয়াছেন, ইইউয়ের শর্তাবলি মানিয়া লওয়া উচিত। কেন তাঁহারা এ কথা বলিতেছেন? ভয়ে? খাদের কিনারায় দাঁড়াইলে ভয় পাওয়া অস্বাভাবিক নহে। ভয় হইতে অনেক সময় বোধের উদয় ঘটে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement