ভারতের মাটিতে আজাদ হিন্দ সরকার। ঘোষণাপত্র পড়ছেন সুভাষচন্দ্র বসু।
হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে বোমা পড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তাইহোকুতে যে বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল, নেতাজি তাতেই মারা গিয়েছিলেন কি না জানি না। এখন থাকলে ওঁর বয়স হত একশো আঠারো। তাঁর সমবর্ষ-জাত নীরদচন্দ্র চৌধুরী নয় নয় করেও অত দিন বাঁচেনি। তবে আমরা ‘আত্মঘাতী বাঙালি’ হলেও নেতাজিকে বাঁচিয়ে রেখেছি এখনও, এখনও তিনি অবধ্য ও অবিনশ্বর, আমরা বিশ্বাস করে চলি, বা করতে চাই, ‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’ বটে, কিন্তু অনন্ত প্রতীক্ষাময় ঘর আমরা সাজিয়ে রেখেছি, আশার পিদিম সে ঘরে সতত জাজ্বল্যমান।
সরকারি নথিতে নেতাজি সংক্রান্ত কোনও নতুন তথ্য হাতে আসার সম্ভাবনা হলেই তাই আমাদের রোমাঞ্চ আর উত্তেজনা বাগ মানতে চায় না, মনে হয় এই বুঝি সেই অন্তিম অন্তর্ধান রহস্যের কুয়াশাপর্দা খসে পড়ল, আমরা জেনে গেলাম বাঙালির ভাবাবেগের কেন্দ্রবিন্দু নেতাপুরুষটি কোথায় সমাহিত বা প্রচ্ছন্ন, তাঁর ‘হন্তারক’ বা ‘অপহরণকারী’রাই বা ঠিক কারা। এই রূদ্ধশ্বাস কলকোলাহল অল্প কয়েক দিন আগেই আমরা শুনলাম, যখন রাজ্য সরকার ৬৪টি ‘নেতাজি ফাইল’ প্রকাশ করলেন। আগামী ২৩ জানুয়ারি যখন কেন্দ্রীয় সরকার ন্যাশনাল আর্কাইভ্স-এ এত দিন সঙ্গোপনে সংরক্ষিত ফাইলগুলি প্রকাশ করতে শুরু করবেন, বাঙালির ভাবাবেগের পারদ তখন যে আবার তুঙ্গে উঠবে, সে বিষয়ে সংশয়মাত্র নেই। কিন্তু এই ভাবাবেগ আর তাকে কেন্দ্র করে যে সম্ভাব্য রাজনীতির প্যাঁচপয়জারের কথা আলোচিত হচ্ছে, তার সঙ্গে ইতিহাসবিদদের সম্পর্ক কী? মহাফেজখানার দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে যে ইতিহাসবিদরা কোনও বিশেষ ঘটনা বা চরিত্র বা সময়কে ভাল করে বুঝতে চান, তাঁদের জগতে সেই সব ফাইল ঠিক কী অভিঘাত নিয়ে আসবে?
গত কয়েক দিন ধরে রাজ্য সরকারের প্রকাশিত ফাইলগুলি নেড়েচেড়ে ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে ঠিক এই কথাটাই বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। সে কাজ করতে গিয়ে মনে হল, এই ফাইলগুলিকে ‘নেতাজি ফাইল’ বলে অভিহিত করার মধ্যেই খানিকটা গলদ রয়েছে, কারণ এদের প্রধান কুশীলব অন্যান্য অনেক ছোটবড় চরিত্র, যাঁদের কার্যকলাপ এবং সে সবের উপর ব্রিটিশ সরকারের নজরদারি থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তার অব্যবহিত পরের বছরগুলিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তিম লগ্নের এক ঘটনাবহুল ইতিহাসের সন্ধান মেলে। সে ইতিহাসের উপর নেতাজির সুদীর্ঘ ছায়া আছে, কিন্তু নেতাজি প্রত্যক্ষ ভাবে নেই। তাঁর অবর্তমানেও ব্রিটিশদের উপর চাপ বহুবিধ, বিশেষ করে ১৯৩৮-৩৯ সাল থেকে ১৯৪৪ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে, যখন বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদের ভয়, কমিউনিস্টদের কার্যকলাপ, কংগ্রেসের তরফে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তুতি, যুদ্ধে জার্মানি আর জাপানের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি, সব এক সঙ্গে ব্রিটিশদের দিশেহারা করে ফেলে, যার ফলে তাদের গ্রাস করে এক অদ্ভুত প্যারানইয়া, ক্ষণে ক্ষণে রজ্জুতে সর্পভ্রম যার পরিণতি।
যুদ্ধের গোড়ার বছরগুলিতে ব্রিটিশদের বেজায় ভয়, এখানকার লাইসেন্সওয়ালা ওয়াকি-টকির মালিকরা ইচ্ছে করে ভলিউম বাড়িয়ে শুনছে অক্ষশক্তির রেডিয়ো প্রোপাগান্ডা, যাতে আশপাশের লোকজনের কানে সে সব আকথা কুকথা সহজে পৌঁছে যায়। বস্তুত, নেতাজি যখন গ্রেফতার বা গৃহবন্দি হননি, সবে ফরওয়ার্ড ব্লক গড়েছেন মাত্র, তখনও সাম্রাজ্যবাদী প্যারানইয়ার নির্ভুল স্বাক্ষর সাহেবদের কাজকর্মে। রংপুরের কারমাইকেল কলেজে ছাত্র জমায়েত, গুয়াহাটির কটন কলেজে ধর্মঘট, বাংলা আর অসমের ছাত্র ঐক্য সমিতি আঞ্জুমান-এ ইত্তেহাদ-এ তলবাইয়ের মধ্যে নড়াচড়া, অতএব কড়া নজর রাখো। ওই বুঝি বিদ্যাসাগর কলেজের স্টাডি সার্কলের দখল নিয়ে নিল এম এন রায়ের অনুগামী ছাত্ররা, চটপট রোখো। এমনকী সেন্ট পল্স কলেজের বার্ষিক ছাত্রসভা, যেখানে নিতান্তই নিরামিষ বাংলা গান আর রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়া হচ্ছে, সেখানেও কড়া নজরদারি। ফাইলকে ফাইল জুড়ে দেখি সরকারি গোয়েন্দারা অক্লান্ত পরিশ্রমে গোপনে পড়ে চলেছেন, কর্তাদের জন্য অনুবাদ করে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের হাজার হাজার চিঠি, আর সে সব চিঠির মধ্যে নিতান্ত আটপৌরে কথাবার্তার মাঝখানে ঢুকে পড়ে বারুদগন্ধ, যেমন কুমিল্লা থেকে কলকাতায় লেখা এই চিঠিতে: ‘আগরতলার অবস্থা ভালই। জ্যোতি ফেল করিয়াছে। কমরেডদের উপর পুলিশের বেশ সুনজর পড়িয়াছে। তাহাদের অবস্থা শীঘ্রই কাহিল হইবে।’
এমতাবস্থায় নেতাজির অন্তর্ধানের পর ব্রিটিশ গুপ্তচরবৃত্তির এই সর্বময়তা যেন আরওই প্রকট হবে, তাতে আর সন্দেহ কী? ফাইলে পড়ি স্ট্যাফোর্ড ক্রিপ্সের উদ্দেশে বার্লিন থেকে প্রদত্ত নেতাজির ভাষণ রেডিয়োর স্ট্যাটিক ছাপিয়ে কোনও ক্রমে শুনে শর্টহ্যান্ডে লিখে নিতে চেষ্টা করেছেন কেউ, তেমনই আবার ১৯৪২-এর মার্চের সাপ্তাহিক নিরাপত্তা রিপোর্টে উঠে আসছে করাচির রয়্যাল এয়ারফোর্সের শৌচাগার থেকে পাঠোদ্ধৃত উর্দুতে লেখা পেনসিল-হুঁশিয়ারি: ‘জাপান নে ইনকে (ছাপার অযোগ্য)-পে খুব মারে হ্যায়।’ সব মিলে এই অস্থির সময়ে সাম্রাজ্যের সুরক্ষা নিয়ে ব্রিটিশদের যে বিনিদ্র রজনী যাপন করতে হয়েছে, তার এক চমৎকার বর্ণনা এই ফাইলগুলিতে। এ যে খুব নতুন কথা তা নয়। সুমিত সরকারের মডার্ন ইন্ডিয়া’তে এই অস্থিরতা, এই বিপ্লবসংকুল বছরগুলির তথ্যনিষ্ঠ বিবরণ আছে, আইসিএইচআর-এর টুওয়ার্ডস ফ্রিডম গ্রন্থমালার খণ্ডগুলিতেও। মিলটন ইজরায়েলও তাঁর ১৯৯৪ সালে লেখা বই কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড পাওয়ার-এ বিশদ ভাবে দেখিয়েছেন ব্রিটিশ শাসনের শেষ কয়েক দশকে সাম্রাজ্যবাদ বনাম জাতীয়তাবাদের লড়াইয়ে প্রোপাগান্ডার ভূমিকা কী অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সদ্য-প্রয়াত ক্রিস বেইলি আর তাঁর ছাত্র টিম হার্পারের মিলিত গবেষণাতেও প্রবল ভাবে উপস্থিত সাম্রাজ্যের যুদ্ধকালীন এবং তার অব্যবহিত পরের সময়কার সংকট। সেই অশান্ত, উদ্বেগসংকুল, কলকোলাহলমুখর সময় সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করবে এই সব ফাইল। কিন্তু নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য তাতে উন্মোচিত হবে না।
সে না হোক, তাতে খুব বেশি ক্ষতি নেই। বস্তুত, যে রহস্যপ্রিয় বাঙালি বিশ্বাসঘাতকতার তত্ত্ব আর বঞ্চনাবোধের মধ্যেই ঐতিহাসিক ভাবে দেগে নিয়েছে তার আইডেনটিটি, তার পাপক্ষয়ের দিনলিপি থেকে এই বহুচর্চিত রহস্যটি হঠাৎ উধাও হলে আমরা আর বাঁচব কী নিয়ে? তাই রহস্য রহস্যই থাক, আমরা বরং ফিরে তাকিয়ে আলাপ করে নিই এই ফাইলসমষ্টির মধ্যেকার আসল সব ইন্টারেস্টিং চরিত্রগুলির সঙ্গে। যেমন, জ্ঞানদাস দত্ত বলে এক পুলিশ অফিসার, স্পেশাল ব্রাঞ্চের অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার। ফাইলকে ফাইল জুড়ে তাঁর সুললিত হস্তাক্ষর। নিবিড় মনোনিবেশে তিনি পড়ে চলেছেন, অনুবাদ করছেন, সংক্ষিপ্তসার লিখছেন পিলে চমকানো সব বইয়ের: পল ফ্রেলিশ-এর রোজা লুক্সেমবুর্গ: হার লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্ক, মার্ক্স-এর ক্যাপিটাল, ম্যাক্স বিয়ার-এর ফিফটি ইয়ার্স ইন ইন্টারন্যাশনাল সোশালিজ্ম, হ্যারল্ড ল্যাসকি-র কার্ল মার্ক্স, ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ পত্রিকার সিরিজ, রাহুল সাংকৃত্যায়নের হিন্দি পুস্তিকা সোভিয়েট বিধান, আরও কত কী! আর মাঝে মাঝে লিখে দিচ্ছেন সায়েব পুলিশকর্তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত অভয়বাণী: ‘This book seems to me to be innocuous.’ যুগপৎ যুদ্ধ আর কমিউনিস্ট বিপ্লবের ভয়ে কেঁচো হয়ে যাওয়া সায়েব পুলিশকর্তাদের অতশত পড়ার সময় নেই যে! যে ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে এই সব বইয়ের মর্মোদ্ধার করে দিতে হয়েছে সায়েব কর্তাদের জন্য, অতি ভাল ছাত্র না হলে সম্ভব নয়। বস্তুত এ রকম তন্নিষ্ঠ পাঠক-গবেষক-বিশ্লেষক পুলিশ আমি খুব কমই দেখেছি।
মনে তাই একটা রহস্য বার বার খোঁচাতে থাকে, নেতাজির অন্তর্ধান রহস্যের থেকে সে রহস্যের মহিমা আমার কাছে কম নয়। এই ধরনের লোকেরা, যাঁরা সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বেতনভুক, হয়তো বিপ্লবীদের পেটাচ্ছেন, কমিউনিস্টদের তাড়া করে বেড়াচ্ছেন, কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়ো’ জিগিরদারদের ধরে ধরে জেলে পুরছেন, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বামপন্থী আর বিপ্লবী রচনা পাঠ করে যাওয়ার অভি়জ্ঞতা কি কোনও প্রভাব ফেলেছিল তাঁদের মনের উপর? বিশেষ করে এমন একটা সময়ে, যখন সবাই জানেন, ব্রিটিশ শাসনের অবসান সময়ের অপেক্ষা মাত্র? তা ছাড়াও, যখন ওই একই ধরনের রচনাকর্ম সম্পূর্ণ অন্য ভাবাদর্শে দীক্ষিত করছে তাঁদেরই মতো অনেক ভাল ভাল ছাত্রকে, শাসক-শাসিতের বিভেদরেখার অন্য পারে? তবে কি এ ভাবেই অজানিতে শিথিল হয়ে যাচ্ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের লৌহশৃঙ্খল? এই সব চরিত্রের মধ্যেই হয়তো নিহিত আছে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্তিম পর্বের এক গোপন ইতিহাস। আগামী ২৩ জানুয়ারি থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের জিম্মায় সংরক্ষিত ‘নেতাজি ফাইল’গুলি প্রকাশ্য হলে হয়তো এ রকম আরও কিছু ইতিহাসের গলিঘুঁজির সন্ধান পাব আমরা। সেই পাওনাটুকুর আশাতেই রয়েছি। ওই সব গলিপথ দিয়ে নেতাজি ফিরবেন কি না জানি না। তবু আমার ওই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।
অধিকর্তা, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও ভারতীয় সংগ্রহশালা