পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
তাঁর সরকারের মেয়াদ শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবারই। আনুষ্ঠানিক ভাবে ৭ মে পর্যন্ত পূর্বতন সরকারের মেয়াদ ছিল। রাতে পশ্চিমবঙ্গের সপ্তদশ বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করেন রাজ্যপাল টিএন রবি। অর্থাৎ, বিধানসভার অস্তিত্বও আর নেই। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েই। এখনও সমাজমাধ্যমে তিনি নিজের পরিচয় পরিবর্তন করেননি। এখনও সেখানে নিজেকে ‘পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী’ বলে পরিচিত করছেন। তাঁর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম পেজ বা এক্স হ্যান্ডল খুললেই এই পরিচয় দেখা যাচ্ছে। নামের আগে সমাজমাধ্যমেও ‘প্রাক্তন’ জুড়তে নারাজ মমতা।
সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলিতে মমতার ছবির নীচে দু’টি পরিচয় উল্লেখ করা আছে। এক, তিনি তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারপার্সন। দুই, তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবারের পর দ্বিতীয় পরিচয়ের আগে ‘প্রাক্তন’ শব্দটি জুড়ে যাওয়ার কথায় কিন্তু মমতার কোনও সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টেই তা করা হয়নি। আগের অবস্থায় কোথাও কোনও পরিবর্তন করা হয়নি।
গত সোমবার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন বিজেপি জিতে নিয়েছে। শাসকদল তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন। এই পরিস্থিতিতে জনগণের রায় মেনে নিয়ে রাজ্যপালের কাছে ইস্তফাপত্র জমা দেওয়াই বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর করণীয়। কিন্তু মমতা সে পথে হাঁটেননি। প্রথম থেকেই বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট লুটের দাবি করে এসেছেন তিনি। অভিযোগ, ১০০টিরও বেশি কেন্দ্রে ভোট লুট করে নেওয়া হয়েছে। তাই বিজেপির এই জয়কে মান্যতা দিতে তিনি নারাজ। আগামী দিনে আইনের পথে হাঁটবেন বলেও জানিয়ে রেখেছেন মমতা। ভোটে হেরে যাওয়ার পরেও মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা না-দেওয়ায় অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে।
তৃণমূলের একাংশের দাবি, বিজেপির ভোট লুট এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রতিবাদ স্বরূপ পদ থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন না মমতা। তিনি চান, তাঁকে বরখাস্ত করা হোক। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লোক ভবন থেকে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও মমতাকে বরখাস্ত করা হয়নি। আবার তাঁকে নতুন সরকারের শপথ পর্যন্ত ‘তদারকি মুখ্যমন্ত্রী’ হিসাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেননি রাজ্যপাল। আগামী শনিবার রাজ্যের নতুন সরকার শপথ নেমে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। তার আগে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত রাজ্যের শাসনভার কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট জবাব কারও কাছে নেই। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এই পরিস্থিতিকে একটা ‘ফ্রিকিশ ইনসিডেন্ট’ (খামখেয়াল) হিসাবে দেখা যেতে পারে। বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার অর্থ মন্ত্রিসভাও অস্তিত্বহীন। তবে সেই মুহূর্তেই নতুন একটি মন্ত্রিসভাকে আত্মপ্রকাশ করতে হবে, এমন কোথাও লেখা নেই। তা ছাড়া, রাজ্যের শাসনকাজ চলে রাজ্যপালের নামে। মন্ত্রিপরিষদ একটি ‘ডেলিগেটেড পাওয়ার এনজয়’ (প্রদত্ত ক্ষমতা ভোগ) করে রাজ্যপালের হয়ে কাজ চালায়। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা বা মন্ত্রিসভা রইল না, তাই বৃহস্পতিবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত রাজ্যপালের ক্ষমতা ব্যবহার করার জন্য কোনও ‘ডেলিগেশন’ বা প্রতিনিধি রইল না। সে ক্ষেত্রে রাজ্যপাল আপাতত সরাসরিই নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। নেকের মতে, চাইলে রাজ্যপাল দেড় দিনের জন্য রাজ্যে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করতে পারতেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রাজ্যপাল রবি তা করছেন না বলেই খবর।
নিজের কেন্দ্র ভবানীপুর থেকে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন মমতা। ভোটে হারের পরের দিন সাংবাদিক বৈঠকে ইস্তফার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলে ওঠেন, ‘‘কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। তাই ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্নই উঠছে না।’’