মু খ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিশ্চিন্ত নাই। নিশ্চিন্ত থাকা তাঁহার পক্ষে সম্ভব নয়। যে কোনও দেশের পক্ষেই প্রতিবেশী দেশের অস্থিরতা দুঃসংবাদ। কিন্তু ভারতের, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের সহিত বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রতিবেশীর অপেক্ষাও নিকটতর। তাহার একটি বড় কারণ মধ্যবর্তী সীমানার চরিত্র। ‘জন্ম-সহোদরা’ দুই বাংলার মধ্যে প্রকৃতিই কাঁটাতারের সীমান্ত কার্যত অসম্ভব করিয়া রাখিয়াছে, এবং বিশ্বদুনিয়ায় নানা সহজভেদ্য সীমান্তের মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরার মধ্য দিয়া প্রসারিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তটিকে অনন্য এক ‘সমস্যা’ করিয়া তুলিয়াছে। গুলশনের নাশকতার পর স্বাভাবিক ভাবেই সেই সীমান্ত লইয়া উদ্বেগ ও অশান্তির শেষ নাই। সেই সুযোগে রাজনীতির জল ঘোলা করিবার প্রয়াসেরও অন্ত নাই। একই সঙ্গে এত রকম সুযোগসন্ধানীকে আটকানো সহজ কাজ নয়। মুখ্যমন্ত্রীর কথাতে বার বার বিষয়টির জটিলতা প্রতিফলিত হইতেছে। চলাচল, বাণিজ্য, এবং সর্বোপরি সাম্প্রদায়িক ও আন্তর্জাতিক মৈত্রী অক্ষুণ্ণ রাখিয়া কী ভাবে অবৈধ চোরাকারবার এবং বেআইনি অনুপ্রবেশ আটকানো যায়, তাহা কেবল ভারতের প্রতিরক্ষা সমস্যা নয়, এই রাজ্যের প্রাত্যহিক চ্যালেঞ্জ। বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে বিধানসভার অভ্যন্তরেও মুখ্যমন্ত্রীকে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে হইবে: সোমবারের কার্যক্রমই তাহার প্রমাণ।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে একটি বিষয় সংশয়ের ঊর্ধ্বে। কেবল রাজ্যের জনবিন্যাসের চরিত্রের জন্য নয়, রাজ্য রাজনীতির বৃহত্তর নৈতিক অভিমুখটি স্থির রাখিবার জন্যই সমস্ত ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন উসকানি বন্ধ করিতে হইবে। শুধু পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক মুসলমানের বাস বলিয়াই এ রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি জরুরি, তাহা নহে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি যাহাতে হীন সংকীর্ণতার বশবর্তী না হয়, তাহা নিশ্চিত করার জন্যই সম্প্রীতি আবশ্যক। এক জন মুসলমানও যদি রাজ্যের বাসিন্দা না হইতেন, তবুও তাহা আবশ্যক। আশা করা যায়, নানাবিধ উসকানি নিবাইয়া মুখ্যমন্ত্রী সেই আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখিতে পারিবেন। ঢাকা-কলিকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস বন্ধ করিবার নির্বোধ প্রস্তাব উড়াইয়া দিয়া তিনি সেই পরম্পরা-বহনের আশ্বাস দিয়াছেন। গত কয়েক বৎসরে বাংলাদেশ ও ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ পরস্পরের অনেক কাছে আসিয়াছে, একাধিক দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান ঘটাইয়াছে। কোনও রাজনৈতিক অর্বাচীনতায় সেই সম্পর্ক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, মুখ্যমন্ত্রীকে তাহা দেখিতে হইবে।
সর্বাপেক্ষা বড় সমস্যা সীমান্ত-অতিক্রমী চলাচল। বাইশ শত কিলোমিটার ব্যাপী দীর্ঘ সীমান্ত ভেদ করিয়া যে প্রাত্যহিক লেনদেন, তাহার অধিকাংশই বেআইনি। প্রতিরক্ষা হইতে রাজনীতি, সকল স্তরেই এই বেআইনি বন্দোবস্ত চালু রাখিবার বিভিন্ন বিচিত্র পদ্ধতি চালু। সেই সব পদ্ধতি এতই পাকাপোক্ত যে সকল স্তরের রাজনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতা ছাড়া তাহা রোধ করা অসম্ভব। মুখ্যমন্ত্রীর মুখে গরু পাচার বন্ধের প্রতিশ্রুতি শোনা গিয়াছে, কিন্তু পাচার বন্ধের জন্য যে বিপুল রাজনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন, তাহার জন্য রাজ্য প্রশাসন প্রস্তুত কি না জানা যায় নাই। পাচার-সংস্কৃতির সহিত সন্ত্রাস-সম্ভাবনার যোগ অতি ঘনিষ্ঠ— ইহাকে গোপন তথ্য বলা চলে না। খাগড়াগড় কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটি রাজনৈতিক অসুস্থতার প্রতীক। মুখ্যমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিতেছেন, তাহা কার্যকর করিতে হইলে অসংখ্য মৌচাকে ঢিল পড়িবে। ঢিল ছুড়িবার কাজটি অসম্ভব না হইতে পারে, কিন্তু অত্যন্ত কঠিন। ছোট মাপের রাজনৈতিক হিসাবের বদলে বড় রাজনীতিকে পাখির চোখ করিলে তবেই একমাত্র তাহা ঘটিতে পারে।