প্রবন্ধ ৩

পুলিশের মেয়ে বলেই

শৈশব থেকে লালিত সব বিশ্বাস ভেঙে গেল এক ধাক্কায়। পুলিশকে বড় অচেনা মনে হল।তখন ছোট। পুলিশ কোয়ার্টার্সের বারান্দা থেকে দেখতাম, নীল রঙের ভ্যান থেকে লোকগুলোকে নামানো হচ্ছে। লক-আপে ঢোকানো হচ্ছে সার দিয়ে। জেনে গিয়েছিলাম, পুলিশের কাজ হল দুষ্টু লোকদের ধরে শাস্তি দেওয়া আর ভাল লোকদের বাঁচানো। ওই আড়াই-তিন বছরের মস্তিষ্ক পুলিশের ‘রক্ষাকর্তা’ ইমেজ বুঝে রোমাঞ্চিত হয়েছিল।

Advertisement

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০১৫ ০০:০১
Share:

তখন ছোট। পুলিশ কোয়ার্টার্সের বারান্দা থেকে দেখতাম, নীল রঙের ভ্যান থেকে লোকগুলোকে নামানো হচ্ছে। লক-আপে ঢোকানো হচ্ছে সার দিয়ে। জেনে গিয়েছিলাম, পুলিশের কাজ হল দুষ্টু লোকদের ধরে শাস্তি দেওয়া আর ভাল লোকদের বাঁচানো। ওই আড়াই-তিন বছরের মস্তিষ্ক পুলিশের ‘রক্ষাকর্তা’ ইমেজ বুঝে রোমাঞ্চিত হয়েছিল।

Advertisement

বাড়িতে বাবা-দাদু-দাদুর বাবা—সবাই পুলিশ। একটু বড় হতে চিমটি কাটা শ্লেষও শুনতাম, ‘তোর বাবার তো মাইনে খরচ হয় না, উপরি রোজগারেই সংসার চলে যায়।’

যারা বলত, ক্ষমা করে দিতাম তাদের। বাইরের লোক কী করে বুঝবে, রাত-বিরেতে আসামি ধরার রেড-এ যেতে কতটা হিম্মত লাগে? ভোটের দিন আর্মহাস্ট্র স্টিটে বাড়ির ছাদ থেকে মস্তানরা যখন বোমা ফেলছিল, তখন বাবা-রা কেমন করে তাদের ধরল? স্‌প্লিন্টার ঢুকে গিয়েছিল বাবার কাঁধে। পুলিশের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস অটুট থাকে।

Advertisement

সাংবাদিকতায় এলাম। জানতাম, পুলিশের ওপর অনেক রকম চাপ। তবুও ভরসা ছিল। নিশ্চয়ই মেরুদণ্ড পুরোটা বিকিয়ে দেবে না। অগ্রজ সাংবাদিকরা শিখিয়েছিলেন, ‘ইনসিডেন্ট কভার করতে গেলে পুলিশের পিছনে থাকবে।’ কত বার হয়েছে, ঘটনাস্থলে আমি আর বাবা, দু’জনেই হাজির। রাতে বাবা বলেছেন, ‘লাঠি চার্জ হচ্ছে, কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে, তখন এতটা সামনে এগিয়ে গিয়েছিলে কেন? সাংবাদিকরা সব সময় পুলিশের প্রোটেকশনে থেকে ইনসিডেন্ট কভার করবে, এটাই থাম রুল।’ কত বার বোমা-গুলি-লাঠির মধ্যে অপরিচিত উর্দিধারীর হাত পিছনে সরিয়ে দিয়ে অভিভাবকসুলভ ধমকানি দিয়েছে, ‘আমাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকুন। এগিয়ে যাবেন না। চোট লাগতে পারে।’

এই পুলিশকেই এত দিন চিনতাম। শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ৮-৯ ঘণ্টার মধ্যে আমার ৩৯ বছরের লালিত ধারণা, ভরসা, অহং সব গুঁড়িয়ে গেল। সল্টলেকে পুরভোটে সারা দিন কয়েকশো লুম্পেন দাপিয়ে বেড়াল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের মাটিতে ফেলে নির্বিচারে মারল, খুন ধর্ষণ মুখে অ্যাসিড ঢালার হুমকি দিল। আর গোটা সশস্ত্র বাহিনী কী অসহায় ভাবে শুধু দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখল!

আগে কোনও নির্বাচনে কি এমন দেখিনি? স্মৃতি হাতড়াই। নাহ্! পুলিশের উপস্থিতিতে ছাপ্পা দেখেছি, কিন্তু তাদের চোখের সামনে সাংবাদিকদের এমন মার নজিরবিহীন। এফডি ব্লকের ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’-এর বুথে দরজার পাল্লা দিয়ে দুই মহিলা সাংবাদিককে প্রায় পিষে ধরে অশ্রাব্য গালাগাল দিচ্ছে ছাপ্পা ভোটারেরা। সামনে দাঁড়ানো রাইফেলধারী পুলিশ পরিস্থিতি মেপে নিঃশব্দে সরে পড়লেন।

রিপোর্টার-ফোটোগ্রাফাররা জমায়েত হয়ে সামনাসামনিই তীব্র সমালোচনায় ঝাঁঝরা করে দিচ্ছিলেন উর্দিধারীদের। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন অফিসারেরা। আচমকা কিছু লুম্পেন এসে এক পুলিশকেই এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করল। এক পুলিশকর্তা পাল্টা লাঠি চালিয়ে কিছু ক্ষণের জন্য হামলাকারীদের হঠিয়ে দিলেন। তার পরই বললেন, ‘এই মারের ছবিটা প্লিজ দেখাবেন না। তা হলে আর চাকরি থাকবে না।’

ইতিমধ্যে দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার ফোন আসতে শুরু করেছে অন্য পুলিশ কর্তার মোবাইলে। পাশের এক ওয়ার্ডে এক সাব ইন্সপেক্টর নাকি বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন। মেরে বার করে দিচ্ছেন বহিরাগতদের। তাঁকে তখনই ‘গ্যারেজ’ করতে হবে। ‘হ্যাঁ স্যর, এ‌খনই করছি স্যর’ বলে কপালের ঘাম মুছলেন বড়কর্তা।

হঠাৎই, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সামনেই, রাস্তার উল্টো দিক থেকে আমাদের দিকে উড়ে আসতে থাকল ইট, ভাঙা টিউবলাইট, কাচের বোতল। গালাগালের বন্যা। মাটিতে ফেলে সাংবাদিকদের অকথ্য মার শুরু হল। আর পুলিশ রুখে দাঁড়ানোর বদলে মুখ লুকিয়ে, মাথা বাঁচিয়ে এ ধার ও ধার দৌড়ে পালাতে লাগল।

আমার হাত-পা তখন কাঁপছে। ভয়ে নয়, বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণায়। ইনসিডেন্ট কভার করতে যাওয়া সাংবাদিকরা কেন পুলিশের পিছনে থেকেও বাঁচতে পারছি না?

এ পুলিশ আমার অচেনা। এরা মাথা বিকিয়েছে ক্ষমতার কাছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement