সম্পাদকীয় ২

বিকল্প অনেক

সদিচ্ছা জরুরি, যথেষ্ট নহে। প্রত্যেকটি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে রান্না করিয়া শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিকে খাবার দিবার প্রচলিত ব্যবস্থাটির বদলে অন্যত্র প্রস্তুত খাবার ওই কেন্দ্রগুলিতে সরবরাহ করিবার যে সুপারিশ কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু দফতরের মন্ত্রী মেনকা গাঁধী করিয়াছেন, তাহার পিছনে সদিচ্ছার প্রেরণা থাকা সম্ভব।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:০০
Share:

সদিচ্ছা জরুরি, যথেষ্ট নহে। প্রত্যেকটি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে রান্না করিয়া শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতিকে খাবার দিবার প্রচলিত ব্যবস্থাটির বদলে অন্যত্র প্রস্তুত খাবার ওই কেন্দ্রগুলিতে সরবরাহ করিবার যে সুপারিশ কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু দফতরের মন্ত্রী মেনকা গাঁধী করিয়াছেন, তাহার পিছনে সদিচ্ছার প্রেরণা থাকা সম্ভব। প্রচলিত ব্যবস্থায় সত্যই ত্রুটি আছে। অনেক দরিদ্র দেশের তুলনাতেও ভারতে মা ও শিশুর অপুষ্টি বিপুল। অঙ্গনওয়াড়ির অব্যবস্থা তাহার একমাত্র কারণ নহে, কিন্তু তাহার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিভিন্ন সমীক্ষায় সেই অব্যবস্থার নানা চিত্র উন্মোচিত হইয়াছে। প্রতি দিন রান্না করিয়া খাবার দেওয়ার বাস্তব সমস্যাগুলি তাহার একটি অঙ্গ। এই সূত্রেই বিকল্প ব্যবস্থার ভাবনা। একসঙ্গে অনেকের খাবার রান্না করিয়া একাধিক অঙ্গনওয়াড়িতে সরবরাহ করিলে সরবরাহের উন্নতি হইতে পারে, এই ধারণা হইতেই মেনকা গাঁধীর বিকল্পভাবনা আসিয়াছে— এমন ধারণা অসঙ্গত নহে।

Advertisement

কিন্তু ভাবনা আসিলেই তাহার রূপায়ণ করিতে নাই, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ, বিকল্প ব্যবস্থাটির সম্ভাব্য সমস্যাগুলি যথাযথ ভাবে বিচার করিয়া দেখা। একটি সমস্যার আশঙ্কা শুরুতেই উঠিয়াছে। বিভিন্ন সমাজকর্মী বলিয়াছেন, এই ব্যবস্থায় আইসিডিএস-এ খাবার সরবরাহের প্রকল্পটি বাণিজ্যিক প্রকল্পে পরিণত হইবে, ফলে তাহার সামাজিক উপযোগিতা কমিয়া যাইবে, বিশেষত ব্যবসায়িক লাভের তাগিদে খাবারের গুণমান নামানো হইবে। বাণিজ্যিক উদ্যোগ সম্পর্কে এই ধরনের বিরাগ বা সন্দেহ এ দেশে সম্পূর্ণ অহেতুক বলা চলে না। যথাযথ পদ্ধতি মানিয়া উদ্যোগীদের নির্বাচন করিলে এবং তাহাদের কাজের যথাযথ তদারকি হইলে এই সমস্যা এড়ানো যায়, কিন্তু বাস্তবে তাহার ভরসা খুব বেশি নহে। গভীরতর সংশয়— সরকারি বরাদ্দ এবং খাবারের উপকরণের বাজারদর, এই দুইয়ের মাঝখানে পড়িয়া খাদ্য সরবরাহের আয়োজন বানচাল হইবে না তো? অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে এমন সমস্যা বিস্তর দেখা গিয়াছে।

বিচারের দ্বিতীয় মাত্রাটি প্রচলিত ব্যবস্থা সংক্রান্ত। অঙ্গনওয়াড়িতেই খাবার রান্না করিবার ব্যবস্থাটি যে সর্বত্র ব্যর্থ, তাহা কিন্তু বলা চলিবে না। তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে এই ব্যবস্থা মোটের উপর ভাল চলিতেছে। বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যেও অঞ্চলভেদে সাফল্য বা ব্যর্থতার তারতম্য বিস্তর। যে কোনও আয়োজনের সাফল্য পরিবেশ ও পরিকাঠামোর উপর নির্ভর করে। বহু ক্ষেত্রেই এক অঞ্চলের সাফল্যের অভিজ্ঞতা হইতে অন্য অঞ্চলের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আছে, যে সুযোগ বিশেষ ব্যবহৃত হয় না। দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে অনেকগুলি কেন্দ্রের জন্য খাবার তৈয়ারির আয়োজনটিকে বাণিজ্যিক বা এমনকী স্বতন্ত্র কোনও সংস্থার হাতেই ছাড়িয়া দিতে হইবে কেন? সংশ্লিষ্ট অঙ্গনওয়াড়িগুলি হইতেই কর্মী ও পরিচালক সংগ্রহ করিয়া স্থানীয় ভিত্তিতে কেন বৃহত্তর আয়োজন করা হইবে না? বিকল্প এক নহে, অনেক। হয়তো সর্বত্র একই বিকল্প উপযোগী নহে। এই কারণেই এ ধরনের প্রকল্প সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব ও অধিকার দিল্লির দেবলোক হইতে স্থানীয় মর্তে হস্তান্তর করা আবশ্যক। মেনকা গাঁধীর সদিচ্ছা যথার্থ হইলে তিনি বলিবেন: অঙ্গনওয়াড়ি সম্বন্ধে রাজ্য এবং স্থানীয় স্তরে নূতন ভাবনা চাই, তাহার পরে সকলে মিলিয়া উন্নতির পথ খুঁজিব। রাজধানীর ঈশ্বর-ঈশ্বরীরা অবশ্য তেমন কথা বলিতে শেখেন নাই।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement