প্রবন্ধ ২

বিরাট শিশু, আনমনে

আরে ভাই, সমস্ত জিনিসটাকে একটা কমপ্লিট রূপ দিতে হবে তো? ধর দুর্গা এলেন, কিন্তু সিংহ এল না, চলবে? কিংবা মহিষাসুর খাঁড়া হাতে মোকাবিলা করতে উঠছে, কিন্তু তলায় ওই মোষটা পড়ে নেই। ছবিটা ষোলো আনা জমজমিয়ে উঠবে কি?

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০১৫ ০০:০৩
Share:

আরে ভাই, সমস্ত জিনিসটাকে একটা কমপ্লিট রূপ দিতে হবে তো? ধর দুর্গা এলেন, কিন্তু সিংহ এল না, চলবে? কিংবা মহিষাসুর খাঁড়া হাতে মোকাবিলা করতে উঠছে, কিন্তু তলায় ওই মোষটা পড়ে নেই। ছবিটা ষোলো আনা জমজমিয়ে উঠবে কি? সে রকমই, পুজো আছে আর আমি নেই, এটা কী রকম হল? আমি তো পুজোরই লোক। যতই অন্যান্য কারণে নামপত্তর করি না কেন, যতই ফিলিমস্টার আর সিরিয়ালের ঘনচক্করদের সঙ্গে পোজ দিয়ে ছবি বাগাই, যতই পাবলিকের কাছে আমার টলটলায়মান ইমেজ ও সেই থিমে সতেরো চুটকি বুগবুগ করুক, আমার আসলি পরিচয় কী? আমি দুগ্গাপুজো অর্গানাইজ করি। সে কী ঘটা, সে কী প্রেস্টিজ! প্যান্ডাল কী হবে, থিম কী হবে, মূর্তিতে কোথায় কী গ্যাঁড়াকল ঘটবে, কোথা দিয়ে লোকে ঢুকবে, ভলান্টিয়ার কী রঙের লাঠি হাতে হম্বিতম্বি করবে, এ ঊনকোটি চৌষট্টি ঘাঁতঘোঁত ম্যানেজ করা চাট্টিখানি কথা? শুধু একটা ঠিকঠাক দুগ্গাপুজো ডিজাইন করতে আর তাকে মাঠে নামাতেই গোটা বচ্ছর লেগে যাওয়া উচিত। আমি তো তা-ই করি। মাঝে মাঝে উঁকিঝুঁকি দিয়ে অন্য রকম সভায় দিদির একটু গুণকীর্তন করে চলে আসি, কোনও দিন হয়তো রক্তদান ক্যাম্পে গিয়ে একটু ছুচটা নেড়ে দেখে এলাম। কিন্তু মন আমার কন্টিনিউয়াস পড়ে থাকে, যাকে বলে, দেবীর চরণতলে। এই পিকচারে আমি বাদ গেলে, মায়ের কি ভোগ হজম হবে? যেখানে কলাবউটিকে অবধি কেউ ছাঁটতে পারেনি, সে স্পেস যতই কম হোক, বেশ্যাবাড়ির মাটি ছাড়া অবধি পুজো হয় না, সে আনতে যতই আধোবাধো ঠেকুক, চালচিত্তিরের ওপরবাগে শিবঠাকুরটি অবধি আঁকতে ভুল হলে চলে না, সে মক্কেলটি যতই অ্যাবসেন্ট থাকুন— সেখানে এই শর্মা ছাড়া বঙ্গভূমে পুজো হবে? তোরা কি করুণাময়ী বলতে বাসস্টপ ছাড়া কিছুই বুঝবিনে?

Advertisement

হ্যাঁ, পুজো করতে ভক্তির চেয়েও যা বেশি লাগে, তা হল পয়সা। এ তো আর সে সত্যযুগ নেই, যে, একটা স্পনসরকে গিয়ে বললুম ‘কাল রাতে মা স্বপ্ন দেছেন এখানে চুরাশি ফুট মন্দির গড়তে, নিজ মাথার মটুকখানি পায়রার ডিম সাইজের হিরে দিয়ে যেন ডট-ডট’, আর তৎক্ষণাৎ সেও জাম্পু দিয়ে খাড়া হয়ে কম্বুকন্ঠে ‘জয় মা, মা আমার’ বলে আকুল আনন্দাশ্রুতে সিলিপ খেয়ে কলসি উপুড় করে জহরত ঢেলে দিলে! এখন সব বেআক্কেলে শয়তান, পয়সা জমলেই অডি কিনে ফেলে! মানুষের সেবায় লেগেছি, রাজনীতিতে নেমেছি, আমারই তো দায়িত্ব বর্তায় সক্কলের কল্যাণের জন্য বড়লোকগুলোর কাছ থেকে পয়সা এনে লাইটিং করার! মায়ের আরাধনা যথাযথ ঝিংচ্যাক না হলে বাংলার উন্নতি সম্ভব? ঠিকঠাক পুজো না করলে যখন রক্তচক্ষু পাকিয়ে অভিশাপ দেবেন, বীরেন ভদ্ররও সে ঘোর কমেন্ট্রি করতে গলা চোক হয়ে যাবে! এই সব ভেবেটেবে এমনিতেই ঘুম হয় না। সারা দিন দৌড়ঝাঁপ, সন্ধে থেকে আবছাবিলাস, এর মধ্যে আবার কোন বড়লোককে ভজাতে গিয়ে কী গুপি দিয়েছি, আর ব্লুপ্রিন্টে কোথায় এট্টুনি কেয়ারলেস মিসটেক ঘটে গেছে, কী করে তার খতেন রাখব? আরে এ তো আর বোর্ডের এগজামিন দিচ্ছি না। তা ছাড়া ভক্তিমার্গে থাকতে গেলে একটু ন্যালাখ্যাপা টাইপ হতে হয়। অঙ্ক-টঙ্ক’য় এরা স্ট্রং হয় না। ডান দিক বাঁ দিক ডেবিট ক্রেডিট গুলে খায় কেরানিরা, রবিনহুডরা বুকভর্তি জীবে প্রেম নিয়ে খপাখপ তির ছোড়ে আর হাততালি পায়। তা ছাড়া আমি ভাল থাকলে আল্টিমেটলি তো মায়েরই ভাল। আমার গোটা জীবনটাই কি তাঁরই প্রতি উচ্ছুগ্গু করে দেওয়া নয়? ইয়ে, একটু ভুল হয়ে গেল। আদ্ধেক জীবন। বাকি আদ্ধেক তো দিদির পায়ে জবা হয়ে ইত্যাদি।

চ্যালাগুলো কী ভাল, আমার নাম করে সারা বাংলা পোস্টারে ছয়লাপ করেছে। পুজোর সভাপতি কে, না আমি। আঃ, শুনে এই পোড়া হাসপাতালেও যেন ফ্রেশ হাওয়া বয়ে যায়। আমার হাতে তৈরি তাজা টাট্টুর মতো ছেলে সব, এ বিপদলগ্নে কি বেইমানি করতে পারে! এই তো কত্ত আন্দোলন করছে, নারা তুলছে: এক জন মন্ত্রীকে কয়েদ করে রাখলে তার সেবা থেকে জনগণ যে বঞ্চিত হচ্ছে, তার প্রতিকার কে করবে? কিন্তু এই হতচ্ছাড়া নিঠুর সেপাইসান্ত্রিগুলো শোনেও না, পোঁছেও না। আরে, সিজন বলে একটা ব্যাপার আছে তো! আশ্বিনের শারদ প্রাতে আমি নাচব হাতকড়া হাতে! আইনকানুন পেরিয়ে একটা বৃহৎ জাস্টিস এই চরাচরে জাগে তো! সেরা ভক্তকে আবার মায়ের কাছে যেতে না দেওয়া যায়? এ তো গাইয়ের বাৎসল্য নিঃসরণের কালে বাছুরকে সরিয়ে নেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা। ওই কথা ভেবেই আমি দুধ মুখে তুলিনে। গায়ের জোর আনতে অন্য জিনিস... যাক গে যাক।

Advertisement

কেউ কি আমার ভেতরের চপচপে ড্রামাগুলিকে আজি একটু খোসা তুলে দেখবে না? বাঙালি জাত অ্যায়সা আবোদা? তারা আমার কাজের, জেলের কয়েদিদের কুসঙ্গে পড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমার হাসপাতালে শান্টিং খেয়ে মাটি কামড়ে থাকার, জামিন না পেলেই বিনবিন ঘাম আর বুক ধড়াসধড়াসের সরলছাপ্পা টেনশনের, বিশাল চক্রান্তের ভিকটিম হয়েও একটি বার বিরোধী-ভয়েস না ছলকাবার ডিগনিটিগুলোর মধ্যে ইনার মিনিং খুঁজবে না? আমি যে আসলে এক পিস বিরাট শিশু, বুঝবে না? বড় সাইজের একটা রাঙা বেলুন রে আমি, নিজ গ্যাসে ঘুরেঘারে বেড়াই ফুরফুরিয়ে, জটজটিল কিচ্ছুটি বুঝি না, কেবল বদন ভরে ‘মা, মা’ ডাকতে চাই।

তোরা আমাকে এই ফেস্টিভ্যালের সময় বন্দি রাখার প্রতিবাদে এ বারটা পুজো বয়কট করতে পারলি নে? আমি দূর থেকে ঢাকের শব্দ শুনব আর আমার পুজোয় অন্য লোক হ্যালো ওয়ান টু থিরি মাইক টেস্টিং করবে? পৃথিবীতে কি এখনও সূর্য-চন্দ্র উঠছে? ঘাসফুল ফুটছে? হায়, তবে কি মা তুমিও আমায় অসুর বলে প্রিন্টিং মিসটেক করে ফেললে?

লেখাটির সঙ্গে বাস্তব চরিত্র বা ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত, কাকতালীয়

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement