সম্পাদকীয় ১

বন্ধু

গত পাঁচ বৎসরে অমিত মিত্র একটি কথা প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হইয়াছেন— তাঁহার মত নাই। তাঁহার জীবন-মাঝে বঙ্গেশ্বরীর ইচ্ছা পূর্ণ হওয়াই দস্তুর। কাজেই, তাঁহাকে জিএসটি-প্যানেলের চেয়ারম্যান করা যে প্রকৃত প্রস্তাবে কালীঘাটের সর্বাধিনায়িকার মন্দিরে ভেট চড়ানো, তাহাতে সন্দেহ নাই। বিজেপি হাত বাড়াইয়া দিয়াছে। প্রশ্ন হইল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাহা ধরিবেন কি? বামফ্রন্ট-কংগ্রেসের জোটে তাঁহার সংখ্যালঘু ভোটে ভাঙন ধরা এক রকম নিশ্চিত।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:০০
Share:

গত পাঁচ বৎসরে অমিত মিত্র একটি কথা প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হইয়াছেন— তাঁহার মত নাই। তাঁহার জীবন-মাঝে বঙ্গেশ্বরীর ইচ্ছা পূর্ণ হওয়াই দস্তুর। কাজেই, তাঁহাকে জিএসটি-প্যানেলের চেয়ারম্যান করা যে প্রকৃত প্রস্তাবে কালীঘাটের সর্বাধিনায়িকার মন্দিরে ভেট চড়ানো, তাহাতে সন্দেহ নাই। বিজেপি হাত বাড়াইয়া দিয়াছে। প্রশ্ন হইল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাহা ধরিবেন কি? বামফ্রন্ট-কংগ্রেসের জোটে তাঁহার সংখ্যালঘু ভোটে ভাঙন ধরা এক রকম নিশ্চিত। এই বাজারে বিজেপি-র সহিত গলাগলি বাড়িলে সেই ভোটব্যাঙ্ক মুছিয়া যাইবার সম্ভাবনা প্রবলতর হইবে। এমনিতেও জেএনইউ কাণ্ড, এবং তাহার প্রতিক্রিয়ায় যাদবপুর বিক্ষোভ ও তাহাতে বিজেপি-র আক্রমণাত্মক অবস্থান লইয়া মুখ্যমন্ত্রীর নীরবতা অনেকের নিকটই বাঙ্ময় ঠেকিতেছে। ভোটের ময়দানে বিরোধীরা সেই প্রসঙ্গগুলিও তুলিবেন। অতএব, এখন বিজেপি-র বন্ধুত্ব স্বীকার করিলে প্রতিদানে তিনি কী কী পাইবেন, বঙ্গেশ্বরী নিশ্চয়ই সেই হিসাব কষিতেছেন।

Advertisement

জিএসটি-র প্রসঙ্গটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট এমনিতেও স্বস্তিজনক নহে। রাজনীতিতে তিনি ছিন্নমূল নহেন, জনতার নাড়ি বুঝিবার ক্ষমতাটি তাঁহার ঈর্ষণীয়। ফলে, তিনি বিলক্ষণ জানেন, পরোক্ষ কর আদায়ের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ছাড়িয়া দেওয়া এক দিকে যেমন তাঁহার যুক্তরাষ্ট্রীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থানের পরিপন্থী, অন্য দিকে তাহা জনমোহিনী রাজনীতির পক্ষেও নেতিবাচক। রাজ্যের প্রয়োজন অথবা দাবি বুঝিয়া করের হার কম-বেশি করিবার অধিকারটি রাজ্যের হাতে থাকাই বিধেয়। যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তার জলবণ্টন চুক্তির প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের অধিকার লইয়া এতখানি সরব, কোন কারণে তিনি জিএসটি-কে সমর্থন করেন, তাহা সম্ভবত অমিত মিত্র জানিবেন। তবে অস্বীকার করিবার উপায় নাই, এখনও অবধি জিএসটি-র প্রশ্নটিকে মুখ্যমন্ত্রী রাজনৈতিক ভাবে দক্ষতার সহিত সামলাইয়াছেন। এই বিলে তাঁহার সমর্থনের আশ্বাসটিকে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মুখে খুড়োর কলের ন্যায় ঝুলাইয়া রাখিয়াছেন। দুর্জনে বলে, এই অস্ত্রেই নাকি সারদাকাণ্ডের তদন্তও ভোঁতা হইয়া গিয়াছে। এখন প্রশ্ন, বিধানসভা ভোটের পূর্বে জিএসটি-র খাতিরে বিজেপির সহিত মিত্রতাকে প্রকাশ্যে আনিবার ঝুঁকি মুখ্যমন্ত্রী নিবেন কি না। অরুণ জেটলিরা জিএসটি-র মোহে কিছু ভোট খোয়াইতে রাজি থাকিতে পারেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কি সেই পথে হাঁটিবেন?

অমিত মিত্রও জানেন, তাঁহার কাজটি রাজনৈতিক। ফলে, চেয়ারম্যান হইবার সংবাদ পাইয়াই তিনি জানাইয়া রাখিয়াছেন, কেন্দ্রের স্বার্থের সহিত রাজ্যগুলির স্বার্থও যাহাতে রক্ষিত হয়, তিনি সেই দিকে নজর রাখিবেন। সেই নজরে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রীয়তার লজ্জা রক্ষা হইবে না। পরোক্ষ কর আদায়ের অধিকার কেন্দ্রের হাতে চলিয়া গেলে রাজ্যগুলির ভূমিকা বড় জোর সাহায্যপ্রার্থীর হইবে। ক্ষমতার দাঁড়িপাল্লা কোন দিকে ঝুঁকিয়া থাকিবে, জানিতে ডিউক ইউনিভার্সিটির পিএইচ ডি ডিগ্রির প্রয়োজন নাই, ইস্ট জর্জিয়াই যথেষ্ট। অমিতবাবু জিএসটি-র সহিত অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্পের স্বার্থকেও জুড়িয়া দিয়াছেন। বলিয়াছেন, গোটা দেশে অভিন্ন করব্যবস্থা থাকিলে এই শিল্পগুলির উপকার। অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্পের পণ্যের সিংহভাগ যে সচরাচর রাজ্যের ভৌগোলিক গণ্ডি অতিক্রম করে না, অর্থমন্ত্রী নির্ঘাত জানেন। কিন্তু, তাঁহার নেত্রী তেলেভাজা শিল্পে বিশ্বাসী। কাজেই, তিনি জিএসটি প্যানেলের চেয়ারম্যান হইলে যে তেলেভাজার কড়াইয়ে উন্নয়নের জোয়ার আসিবে, সেই কথাটি অমিতবাবু গাহিয়া রাখিলেন। কে বলে, রাজনীতিতে তাঁহার তেমন অভিজ্ঞতা নাই?

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement