সম্পাদকীয় ২

বন্ধু কাহাকে বলে

গ ত সপ্তাহে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের ইজরায়েল-বিরোধী ভোটে বিশ্ব স্তম্ভিত: ইজরায়েলের জুডিয়া ও সামারিয়া অঞ্চলে নূতন বসতি নির্মাণ চলিতেছে, সেখানকার নির্মাণকার্য অবৈধ বলিয়া ঘোষিত হইল। স্তম্ভিত না হইয়া উপায় নাই।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ ০০:০১
Share:

গ ত সপ্তাহে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের ইজরায়েল-বিরোধী ভোটে বিশ্ব স্তম্ভিত: ইজরায়েলের জুডিয়া ও সামারিয়া অঞ্চলে নূতন বসতি নির্মাণ চলিতেছে, সেখানকার নির্মাণকার্য অবৈধ বলিয়া ঘোষিত হইল। স্তম্ভিত না হইয়া উপায় নাই। নিরাপত্তা পরিষদে ইজরায়েলের এত দিনের বিশ্বস্ত বন্ধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উপস্থিত থাকিতেও তীব্র ইজরায়েল-বিরুদ্ধতার মতো অসম্ভব কাজ সম্ভব হইল? হইল, কেননা মার্কিন প্রতিনিধিরা ভোটদানে বিরত থাকিলেন। অবশ্যই ইহা চিরকালীন মার্কিন নীতির সুচিন্তিত সংশোধন। ক্ষিপ্ত ইজরায়েলের মতে, প্রেসিডেন্ট ওবামার আমেরিকা কেবল ভোটদানে বিরত থাকে নাই, বিভিন্ন সূত্রে নাকি জানা গিয়াছে যে, ইজরায়েলের বিরুদ্ধে প্রস্তাবটি রচনাও করিয়াছে তাহারা, এবং সকলকে এককাট্টা করিয়া তাহা পাশ করাইয়া লইয়াছেও তাহারা। মার্কিন প্রশাসন এই অভিযোগে আপত্তি জানাইলেও বসতিনির্মাণ লইয়া তাহাদের মত যে জানিয়া-বুঝিয়াই দেওয়া হইয়াছে, মুক্তকণ্ঠে সে কথা স্বীকার করিয়াছে। ‘বন্ধু কখনও বন্ধুর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে যায় না’— ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এই ব্যথিত বক্তব্য বজ্রকঠিন হুমকির সহিত মিশিয়া ভাসিয়া আসিয়াছে: ‘ইহার ফল ভাল হইবে না।’

Advertisement

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইহার ফল ভাল-মন্দ যেমনই হউক, নিঃসন্দেহে গুরুতর হইবে। প্রেসিডেন্ট ওবামা কিছু কাল ধরিয়াই ইজরায়েলের প্রতি অনাবিল মার্কিন সমর্থনের ধারার গতি কমাইতেছিলেন। ঘটনা হইল, বসতি নির্মাণ লইয়া দুই দেশের দ্বিমত বারংবার প্রকাশ্যে আসিয়াছে। তবে এ বারে যাহা নূতন— নিরাপত্তা পরিষদে সেই প্রস্তাব পাশ হওয়া। নেতানিয়াহুর প্রশাসনের আশা ছিল, রাষ্ট্রপুঞ্জ অবধি অশান্তি কখনও গড়াইবে না, ওয়াশিংটনের ঠান্ডা ঘরেই কোনও না কোনও ভাবে নিষ্পত্তি হইবে। সেই আশায় ছাই পড়ার ফলে ইজরায়েল প্রশাসনের সহিত মার্কিন ইহুদি লবিও বিপুল পরিমাণ খেপিবে। ইতিমধ্যেই ওবামার বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভের স্বর। মার্কিন রাজনীতি, এবং অবশ্যই অর্থনীতি, যেহেতু অনেকাংশেই ইহুদি নেতৃত্ব-নির্ভর, এই বিক্ষোভের জের অনেক দূর গড়াইবে ধরিয়া লওয়া যায়।

জের বেশ কিছু দূর গড়াইতে বাধ্য, কেননা এ বারের ইজরায়েল-বিরোধী (তথা আরব-পন্থী) পদক্ষেপটিকে আপাতত ওবামার সাধারণ মুসলিমপ্রিয়তার নিদর্শন বলিয়া ধরিয়া লওয়া হইতেছে। ইজরায়েলের বসতি-বাড়াবাড়ির প্রশ্নে ক্রমশ বাড়িতে থাকা মার্কিন অস্বস্তি ধীরে ধীরে তুচ্ছ হইয়া যাইতেছে, পড়িয়া থাকিতেছে সেই মুসলিম বিশ্ব বনাম অ-মুসলিম বিশ্ব ভাগ। যে আরব-ইজরায়েল সংঘর্ষ প্রায় সাত দশক ধরিয়া গোটা বিশ্বকে জেরবার করিয়া রাখিয়াছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বাধিক বিপজ্জনক, রক্তাক্ত, বিষদুষ্ট ক্ষতস্থান হইয়া উঠিয়াছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজের মাটিতে তাহা কিন্তু ইতিপূর্বে এমন ভাবে নিজেকে প্রকাশিত ও প্রসারিত করে নাই। এই মুহূর্তে দেশের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ওবামা ও আগামী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে অতি দৃঢ় একটি বিভাজিকা তৈরি করিল নিরাপত্তা পরিষদের ঘটনা। ট্রাম্প যেহেতু সর্বার্থেই নব্যপন্থী, প্রথা ভাঙিয়া নিজের দায়িত্বগ্রহণের আগেই তিনি ঘোষণা করিয়া দিলেন নিজের ভবিষ্যৎ নীতি, বলিয়া দিলেন ক্ষমতায় আসিয়াই তিনি সিদ্ধান্ত উল্টাইয়া দিবেন। নিরাপত্তা পরিষদে এমন ওলটপালট কতখানি তিনি পারিবেন, ইহাই এখন দেখিবার।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement