সম্পাদকীয় ২

ভুল পথের বিপদ

শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু— পরিচিত পন্থা। বিপজ্জনকও। এই পথ তত ক্ষণই বিধেয়, যত ক্ষণ ‘বন্ধু’র নৈতিক অবস্থান যথাযথ। নচেৎ বিস্ফোরণ। যেমনটি ঘটিল তুরস্কে, ইস্তানবুল শহরের আতাতুর্ক বিমানবন্দরে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এর্দোগান কি ক্রমে আপন ভ্রান্তি টের পাইতেছেন?

Advertisement
শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০১৬ ০০:০০
Share:

শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু— পরিচিত পন্থা। বিপজ্জনকও। এই পথ তত ক্ষণই বিধেয়, যত ক্ষণ ‘বন্ধু’র নৈতিক অবস্থান যথাযথ। নচেৎ বিস্ফোরণ। যেমনটি ঘটিল তুরস্কে, ইস্তানবুল শহরের আতাতুর্ক বিমানবন্দরে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এর্দোগান কি ক্রমে আপন ভ্রান্তি টের পাইতেছেন? সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া মধ্য এশিয়ায় ক্ষমতার দখলদারিতে আপন পাল্লা ভারী করিবার উদ্দেশ্যে আসাদের প্রতিপক্ষ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ক্রমাগত মদত দিয়া আসিয়াছেন। ইসলামিক স্টেটও এই প্রশ্রয় কব্জি ডুবাইয়া ভোগ করিয়াছে। দক্ষিণ তুরস্কের সীমানার একটি বিরাট অংশ আইএস জঙ্গিদের যাতায়াতের স্বর্গ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। শুধু তাহাই নহে, জঙ্গিরা তুরস্ককে ব্যবহার করিত ঘাঁটি এবং যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে। এর্দোগান এ সবই উপেক্ষা করিয়াছেন, কারণ তাঁহার নিকট তখন পাখির চোখ ছিল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে গদিচ্যুত করা, এবং কুর্দদের শায়েস্তা করা— কুর্দদের প্রতিপক্ষ হিসাবেও আইএস তৎপর। কিন্তু বন্ধু ক্রমে ভয়াবহ আকার ধারণ করে, আইএস কার্যত গোটা দুনিয়ার ত্রাস হইয়া দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত রাশিয়া ও আমেরিকার যৌথ চাপে তুরস্ক আইএস দমন অভিযানে শরিক হইতে বাধ্য হয়। বন্ধু এর্দোগানের এই শত্রুবৎ আচরণ ইসলামিক স্টেটকে ক্ষুব্ধ করিয়াছে। অতএব তাহারা একের পর এক পাল্টা আক্রমণ চালাইতেছে। ইস্তানবুল সর্বশেষ হানা, কিন্তু শেষ হানা বলিয়া মনে করিবার কোনও কারণ নাই।

Advertisement

এই সমস্যা একা তুরস্কের নহে। বহু দেশই বন্ধু বাছিতে গিয়া এই ভ্রান্তির শিকার হইয়াছে। ক্ষুদ্র ও স্বল্পমেয়াদি সাফল্যের পিছনে ছুটিলে বৃহত্তর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এই সহজ সত্যটি রাষ্ট্রনায়করা প্রায়শই ভুলিয়া যান। দীর্ঘ দিন তালিবানদের প্রশ্রয় দিবার ফল পাকিস্তান এখন ভোগ করিতেছে, একের পর এক জঙ্গিহানায় শাসকরা বিপর্যস্ত। আমেরিকাও এমন অবিমৃশ্যকারিতার দায় হইতে মুক্ত নহে। বিভিন্ন সময় নিজেদের স্বার্থে এক একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধ শক্তি তৈয়ারিতে ওয়াশিংটন মদত জুগাইয়াছে। সেই শক্তি সন্ত্রাসী হইলেও। ফল: বোতল হইতে বিবিধ দৈত্যের উদয়। যেমন, ওসামা বিন লাদেন। আইএস-এর উদ্ভবের জন্য আমেরিকাকে দায়ী করিলে আগমার্কা বামপন্থীদের অন্যায়ের শরিক হইতে হয়, কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে, বারাক ওবামা আইএস দমনে কিছু আগে সক্রিয় হইলে দানব এত দূর বাড়িত না।

রাষ্ট্রনায়করা বারংবার এই ভুল করেন, কারণ তাঁহারা দ্রুত কার্যসিদ্ধিকে যতটা মূল্য দেন, নৈতিকতাকে তাহার এক শতাংশও দেন না। যুদ্ধজয়ের অন্যায় কৌশলকে প্রশ্রয় দিলে সেই অন্যায় কোনও এক সুপ্রভাতে কাম্য ‘ন্যায়’ আনিয়া দিবে— এই ধারণা বাতুলতার নামান্তর। উদ্দেশ্য ও পথ, এই দুইয়ের মধ্যে টানাপড়েন প্রাচীন। বহু সময় সৎ উদ্দেশ্য সফল করিবার লক্ষ্যে ভুল পথ গৃহীত হয়। হয়তো বা সেই পথ আপাত-সাফল্য আনিয়াও দেয়, কিন্তু ইতিহাস বার বার বলিয়াছে, সেই সাফল্য ক্ষণস্থায়ী। বন্ধু বাছিতে গিয়া নৈতিকতার পথ পরিত্যাগ করিলে, শত্রু দমনের জন্য শয়তানকে দুধকলা সেবন করাইলে পরিণাম ভাল হইতে পারে না। বিষের বীজ বপন করিলে তাহা হইতে বিষবৃক্ষ তো হইবেই, সেই বৃক্ষের ফল অনেককেই ভোগ করিতে হইবে, কিন্তু যে মাটি বীজ ধারণ করিয়াছে, তাহা অনাক্রান্ত, নির্মল, সুফলা থাকিবে, এমন কল্পনা অলীক। নির্বোধও। তুরস্ক বিষবৃক্ষ লালন করিয়াছে, এখন তাহার স্বভূমি আক্রান্ত।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement