সম্পাদকীয়

শাসনাবিষ্ট

সম্মান বড় জটিল কাণ্ড। মানুষের প্রাথমিকতম যে প্রবৃত্তি, নিজ প্রাণ রক্ষা— তাহা অবধি সম্মানের খাতিরে পিছু হটিয়া যায়। কখনও আপন সম্মান রাখিতে নারী জওহর ব্রত পালন করেন, কখনও পুরুষ বেণীর সহিত মাথাটিও দিবার অঙ্গীকার করেন।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৬ অগস্ট ২০১৫ ০০:০১
Share:

সম্মান বড় জটিল কাণ্ড। মানুষের প্রাথমিকতম যে প্রবৃত্তি, নিজ প্রাণ রক্ষা— তাহা অবধি সম্মানের খাতিরে পিছু হটিয়া যায়। কখনও আপন সম্মান রাখিতে নারী জওহর ব্রত পালন করেন, কখনও পুরুষ বেণীর সহিত মাথাটিও দিবার অঙ্গীকার করেন। যাঁহারা নিজ প্রাণের অপেক্ষা সম্মানকে অধিক মূল্য দেন, তাঁহাদের প্রতি শ্রদ্ধায় আমাদের মন প্রণত হইয়া আসে। মুশকিল ঘটে, যখন নিজ সম্মান রক্ষার জন্য কেহ অন্যের প্রাণ লইতে সচেষ্ট হইয়া পড়েন। ‘অনার কিলিং’ বা সম্মান রক্ষার্থে হত্যার বহু ঘটনা শুনিতে শুনিতে এখন আমাদের গা-সহা হইয়া গিয়াছে। কোথাও খাপ পঞ্চায়েত এই হত্যার অনুশাসন জারি করিতেছে, কোথাও পিতা কাটারির কোপ মারিয়া কন্যাকে হত্যা করিতেছে আর মাতা সেই হননে সাহায্য করিতেছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম-ক্লান্ত মানুষকেও স্তম্ভিত করিয়া দিল দুবাইয়ের এক পুলিশ-কর্তাব্যক্তির বিবৃতি। কর্মজীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলিতে গিয়া, তিনি শুনাইলেন, দুবাইয়ের এক সমুদ্রসৈকতে ঘুরিতে আসিয়াছিল এক পরিবার। তাহাদের বিশ বৎসর বর্ষীয়া কন্যা অকস্মাৎ সমুদ্রে ডুবিয়া যাইতে যাইতে আর্তনাদ করিতে থাকে। মুহূর্তে দুই জন লাইফগার্ড ছুটিয়া যায়, মেয়েটি তীরের নিকটেই ছিল, তাহাকে বাঁচানো কঠিন হইত না। কিন্তু বাদ সাধিল মেয়েটির পিতা। সেই বলশালী ব্যক্তি দুই লাইফগার্ডকে প্রবল শক্তির সহিত নিরস্ত করিতে লাগিল, হিংস্র ভাবে বাধা দিল মেয়েটিকে বাঁচাইতে, কারণ পরপুরুষ স্পর্শ করিলে, মেয়েটি অপবিত্র হইয়া যাইবে। তাহার চেয়ে তাহার মরণ অধিক কাম্য। মেয়েটিকে বাঁচানো যায় নাই। সরাসরি না হইলেও, ইহাও পরোক্ষে অনার কিলিং-ই হইল।

Advertisement

এই যে সম্মান এক জনের, আর তাহা রক্ষার্থে হত্যাটি হইবে অন্য জনের, ইহা বড় সুবিধাজনক আদর্শ। সন্তানকে মারিতে পিতামাতার কষ্ট হয় অবশ্যই, কিন্তু নিজেদের আদর্শটিকে পালিয়া পুষিয়া বড় করিবার সুখের তুলনায় নিশ্চয় তাহার ওজন অধিক নহে। ‘আদর্শ’ কেন প্রায় সর্বদাই যৌন রক্ষণশীলতার সহিত সমার্থক হয়, তাহাও এক রহস্য। যৌন ‘পবিত্রতা’র সংজ্ঞাও নানাবিধ। খাপ পঞ্চায়েত বলিয়া থাকে, একই গ্রামের দুই জন বিবাহ করিলে, তাহা হত্যাযোগ্য অপরাধ, কারণ তাহারা ভ্রাতা ও ভগ্নীই। ইহা ব্যতীত হত্যার প্রধান কারণগুলি হইল, কেহ যখন পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়া, নিজ ইচ্ছায় তাহার জীবনসঙ্গী নির্বাচন করিতেছে, বা অন্য জাতের ব্যক্তিকে বিবাহ করিতেছে, কিংবা ধর্ষিতা হইতেছে! ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনায় সমকামীদের খুন করিবার নিমিত্ত সংগঠন রহিয়াছে। পরিবার নহে, দেশের সম্মান রক্ষার্থে সেইখানে ‘ভ্রষ্ট’ মানুষদের খুন করা হইতেছে। ইংল্যান্ডে প্রতি বছর গড়ে ২০-২২টি অনার কিলিং হয়। করে মূলত দক্ষিণ এশীয় লোকেরা। হয়তো কন্যা ছোট স্কার্ট পরিয়া হাঁটিতেছিল, বা পুরুষবন্ধুর সহিত দেখা করিয়াছিল। সৌদি আরবে এক ব্যক্তি তাহার কন্যাকে খুন করিয়াছে ফেসবুকে চ্যাট করিবার অভিযোগে।

সন্তানকে এমন তাৎপর্যহীন কারণেও হত্যা করা যাইতেছে, তাহার কারণ যৌন শুচিতা সম্পর্কে বিকৃত ধারণাই কেবল নহে, ইহার মূলে রহিয়াছে সন্তানকে ব্যক্তি নহে, সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করিবার মনোবৃত্তি। সম্পত্তি হস্তচ্যুত হইলে, বা খুঁতযুক্ত হইয়া যাইলে, পরিবারের কোনও কাজে আর লাগিল না। তাই ধর্ষিতা সন্তান, বা পাশ্চাত্য (সুতরাং অশ্লীল) মূল্যবোধে দীক্ষিত সন্তান, বা পরিবারের বিরোধী আদর্শে উৎসাহী হইয়া অন্যকে বাছিয়া লওয়া সন্তানকে রক্ষা অপেক্ষা ধ্বংস করাই কাম্য। যে পিতা কন্যাকে তলাইয়া যাইতে দেখিয়াও তাহার প্রাণের অপেক্ষা যৌন শুচিতার কথা ভাবিতেছে, সে উন্মাদ নহে, প্রকৃতপক্ষে শাসনাবিষ্ট, নিয়ন্ত্রণ-আকাঙ্ক্ষাচ্ছন্ন। অধীনস্থ বস্তু অপবিত্র হইলে, তাহাকে আর ডাঙায় তুলিয়া ফিরাইয়া লইবে না।

Advertisement

য ৎ কি ঞ্চি ৎ

Advertisement

এ বার তালিবানরা আইএস-এর নিন্দে করল। আসলে দুর্নীতিরও তো র‌্যাংকিং আছে, গব্বর আর সাম্বা তো সমান সম্মান পায় না। আমরা ফাটাকেষ্টকে কুর্নিশ করি, ছিঁচকে মস্তানকে নিয়ে হাসি। তাই কম্পিটিশনে থাকতে গেলে আতঙ্কের মাস্টার হতে হবে। আইএস তালিবানকে কুখ্যাতি ও ভীতি-ইনডেক্সে বহুত পিছনে ফেলে দিয়েছে, নাগাড়ে ধর্ষণ চালাচ্ছে, বন্দির মাথা কাটার ভিডিয়ো ইউটিউবে দিচ্ছে। তালিবান পড়েছে মুশকিলে, পা কাটলে তো আর টিআরপি উঠবে না!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement