সম্পাদকীয় ২

শত্রুর বন্ধু

শত্রুর শত্রু যে বন্ধু, তাহা সর্বজ্ঞাত। কিন্তু শত্রুর বন্ধু কি বন্ধু, না শত্রু? ধাঁধা নয়, দিল্লির সামনে ইহাই এখন নিদ্রহারণকারী কূটনৈতিক সংকট। রাশিয়া যে পাকিস্তানের সহিত একত্র সামরিক গাঁটছড়া বাঁধিতেছে, দুইয়ে মিলিয়া যৌথ মহড়া শুরু করিয়াছে, এবং সর্বোপরি, উরির জঙ্গি হানার পর সেই সামরিক মহড়া মহাড়ম্বরে সূচিত হইয়াছে— এই ঘটনাক্রম হইতে দিল্লির ঠিক কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত?

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০০:০০
Share:

শত্রুর শত্রু যে বন্ধু, তাহা সর্বজ্ঞাত। কিন্তু শত্রুর বন্ধু কি বন্ধু, না শত্রু? ধাঁধা নয়, দিল্লির সামনে ইহাই এখন নিদ্রহারণকারী কূটনৈতিক সংকট। রাশিয়া যে পাকিস্তানের সহিত একত্র সামরিক গাঁটছড়া বাঁধিতেছে, দুইয়ে মিলিয়া যৌথ মহড়া শুরু করিয়াছে, এবং সর্বোপরি, উরির জঙ্গি হানার পর সেই সামরিক মহড়া মহাড়ম্বরে সূচিত হইয়াছে— এই ঘটনাক্রম হইতে দিল্লির ঠিক কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত? প্রশ্নটি উল্টা দিক দিয়াও সমধিক গুরুতর। বন্ধুর শত্রুর সহিত কেমন সম্পর্ক রাখা উচিত, অধিক পাত্তা না অধিক তোষণ, ভারত বিষয়ে ইত্যাকার আত্মসমীক্ষায় মস্কোও এই মুহূর্তে যথেষ্ট জর্জরিত। পাকিস্তানের সহিত মহড়া শুরু হইবার স‌ংবাদে মস্কোর নীতি-প্রণেতাদের একটি অংশ প্রবল বিরক্তি প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে এ ভাবে খামখা ভারতকে চটানোর মধ্যে অত্যন্ত অগভীর কূটদৃষ্টি রহিয়াছে। কার্নেগি মস্কো সেন্টার-এর দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ তোপিচকানভের স্পষ্ট মত যে, এই মুহূর্তে ভারত সংযত প্রতিক্রিয়া দিলেও ইহার ফলে ভারত-রুশ সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিস্তর সম্ভাবনা। ভারত-মার্কিন নৈকট্য লইয়া মস্কোর মাথাব্যথার শেষ নাই। সেই সম্পর্ক রুশ-পাকিস্তান অস্ত্র-মহড়ার ফলে ঘনিষ্ঠতর হইবে, রাশিয়ার উপর চাপ বাড়িবে। ঠান্ডা যুদ্ধকালীন অক্ষ ও প্রতি-অক্ষ এমনিতেই এক শত আশি ডিগ্রি ঘুরিয়া গিয়াছে, ভারতের গভীর আস্থা এখন মার্কিন দেশের উপর, আর পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া! সেই শিবির-বিভাজনের রেখাটি এত স্পষ্ট ও এত চূড়ান্ত করিবার দরকার ছিল না।

Advertisement

মস্কোর অন্দরমহলে দ্বিধা ও সংশয় যে সমানেই ঢেউ তুলিতেছে, তাহার প্রমাণ মহড়া শুরু হইবার সামান্য কিছু আগে বিতর্কিত অঞ্চল পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে মহড়া না হইবার ঘোষণা। ‘পিওকে’ অঞ্চলে রাশিয়ার পদার্পণ করিয়া পাকিস্তানের সঙ্গে কোনও যৌথ পদক্ষেপ করার অর্থ— সেই ভূমির উপর রাশিয়ার পক্ষ হইতে পাকিস্তানের অধিকারটিকে স্বীকৃতি দেওয়া ও ভারতের গালে একটি বিরাট চপেটাঘাত। এতখানি করিতে যে মস্কো রাজি হয় নাই, তাহাই প্রমাণ করে, দিল্লিকে একেবারে শত্রু বলিয়া দাগাইয়া দিতে এখনই সে প্রস্তুত নয়। হাজার হউক, ভারত অনেক দিনের মিত্র। বিপরীতে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীও সতর্ক পা ফেলিতেছেন। যৌথ মহড়ার খবর আসিবার পরও তাঁহার মন্তব্য, রাশিয়া-ভারত বোঝাপড়ার দীর্ঘ ইতিহাস শেষ হইয়া যায় নাই। অকস্মাৎ কোনও বড় সংকট উপস্থিত হইলে আজও হয়তো অভ্যাসবশত দিল্লির প্রথম ফোনটি মস্কোতেই যাইবে।

কূটনীতিতে কূটবাক্য জরুরি। মোদীর উপরের বাক্যটি প্রধানত কূটবাক্য, ইহা ধরিয়া লইয়া বলা যায় যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের প্রথম কর্তব্য, মার্কিন-ভারত বন্ধন দৃঢ়তর করা। এই মুহূর্তে রুশ-ভারত বাণিজ্য অপেক্ষা মার্কিন-ভারত বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় দশ গুণ বেশি। সেই ব্যবধানকে আরও অনেক বাড়াইবার প্রচেষ্টা। দ্বিতীয়ত, ভারত-মার্কিন অক্ষে আপাতত যোগ দিতে উৎসুক চিন সাগরের যে নূতন বন্ধু, জাপান, তাহার সহিত বন্ধন আঁটো করিয়া ত্রিশক্তি-যোগে রাশিয়া ও পাকিস্তানকে যথাসাধ্য চাপে রাখা। তৃতীয়ত, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কিছু দিন পরই ভারত সফরে আসিতেছেন। সেই সফরে ভারত যেন প্রত্যয় ও শক্তির অবস্থান হইতে আলোচনায় যোগ দিতে পারে, দুর্বলতার স্থান যেন না থাকে, এখন তাহাই দিল্লির পাখির চোখ হউক।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement